ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গণমাধ্যম কমিশন

সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক নয়, অভিভাবক হোক

সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক নয়, অভিভাবক হোক
×

মো. মশিহুর রহমান

মো. মশিহুর রহমান

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৬ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে দীর্ঘকাল আলোচনা চললেও সামগ্রিক কাঠামোগত, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। আশার কথা, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে দাবি উঠেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছিল। ওই কমিশনের সুপারিশের ধারাবাহিকতায় চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৬’ চূড়ান্ত খসড়া তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তোলা হয় সর্বসাধারণের মতামত দেওয়ার জন্য।

‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ নিশ্চয়ই সময়োচিত পদক্ষেপ। মৌলিক প্রশ্নটি হলো, প্রস্তাবিত কমিশন কি সংবাদমাধ্যমের গভীর সংকটগুলো দূর করে স্বাধীন সাংবাদিকতা, পেশাগত মান ও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে, নাকি এটি নিয়ন্ত্রণের আরেকটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে কমিশনের নিয়োগ পদ্ধতি, আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সর্বোপরি এর প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনের ওপর। 

ক. নিয়ন্ত্রণ নয়, স্বনিয়ন্ত্রণ
স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের প্রথম ও প্রধান নীতি হওয়া উচিত সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করা। কোন আধেয় প্রকাশিত হবে, কোনটি হবে না, কোনো বিষয়ে কী সম্পাদকীয় অবস্থান নেওয়া হবে– এসব সিদ্ধান্ত একান্তভাবেই সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতার অংশ।

বরং কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত সংবাদমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের ২(৬) ধারায় স্বনিয়ন্ত্রণকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। স্বনিয়ন্ত্রণ হলো আইন ও প্রতিষ্ঠিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতিমালা ও পেশাগত আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমে পরিচালিত সার্বিক ব্যবস্থা। এই আধুনিক ধারণাকেই প্রস্তাবিত কমিশনের মূল প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনে পরিণত করতে হবে।

বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতিমালা, নৈতিক মানদণ্ড এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এখনও অস্পষ্ট ও দুর্বল। যার ফলে সামগ্রিকভাবে স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর ভিত্তি পায়নি। কমিশন এ-জাতীয় স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য সার্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়ন তদারক করতে পারে; কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সংবাদ বা মতামতের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আইনের অধীনে থেকে এই প্রতিষ্ঠান মতের বহুত্ব, মালিকানার বহুত্ব, জনস্বার্থমূলক অনুষ্ঠান প্রচার এবং নাগরিকের তথ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে কাজ করবে। প্রকৃত স্বনিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের নির্বাহী নির্দেশে নয়, বরং পেশাজীবীদের নিজস্ব অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা থেকে উৎসারিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

প্রস্তাবিত কমিশন এখানে সরাসরি নিয়ন্ত্রণকারী না হয়ে কেবল আইনি ও পেশাগত সহায়ক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। কমিশন কোনো আধেয়র নজরদারি প্রতিষ্ঠান নয়; বরং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবক হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, স্বাধীন কমিশনের প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা থাকতে হবে, তবে সেই ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমারেখাও থাকতে হবে। ‘নৈতিকতা’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য’ বা ‘জনস্বার্থ’ প্রভৃতি অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করে সংবাদ বন্ধ করা, লাইসেন্স বাতিল বা শাস্তির সুযোগ রাখা বিপজ্জনক। অস্পষ্ট ও বিস্তৃত আইনি ভাষা কীভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্তরায় হয়, সে অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। কমিশনের ক্ষমতা যাতে সেন্সরশিপের রূপ না নেয়; পাশাপাশি কমিশনের যে কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ও স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকতে হবে।

খ. পুরোনো কাঠামো নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম পরিচালনা দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত ও বহুস্তরে খণ্ডিত। সংবাদপত্রের জন্য এক কাঠামো; সম্প্রচার মাধ্যমের জন্য আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অনলাইনের জন্য ভিন্ন আইনগত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই বিভক্ত ব্যবস্থাপনা প্রশাসনিক জটিলতা ও এখতিয়ারের অস্পষ্টতা বাড়িয়েছে।

‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ ২০২৫ সালে বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল এবং প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনের দায়িত্ব সমন্বয় করে স্বাধীন ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন মূলত মুদ্রণ মাধ্যমের জন্য তৈরি, বর্তমান মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার অনুপযোগী। টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমগুলো এই এখতিয়ারের বাইরে থাকায় সংবাদমাধ্যমে অভিন্ন জবাবদিহি গড়ে ওঠেনি। তাই সব মাধ্যমের জন্য সমন্বিত প্রতিষ্ঠান গঠন যৌক্তিক; কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং সব মাধ্যমে পেশাগত মান ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য।

গ. স্বাধীনতা ও সার্বিক নিরাপত্তা
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাংবাদিকের ‘প্রকাশ-পরবর্তী নিরাপত্তা’ নিশ্চিত থাকে। সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিক মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা কিংবা চাকরিচ্যুতির মতো পেশাগত অনাচারের কবলে পড়লে আইনের স্বাধীনতা কাগুজে বচনে পরিণত হয়। 
খসড়া অধ্যাদেশের ১৩ ধারায় সাংবাদিকদের সুরক্ষার মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা ইতিবাচক উদ্যোগ। এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে যে কোনো হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি সহায়তা ও প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত যোগাযোগের নিরাপত্তাও আইনগতভাবে সুরক্ষা করতে হবে। ভীতিহীন কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব।

ঘ. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
পেশাগত সাংবাদিকতার সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্ক নিবিড়। যে সাংবাদিক অনিয়মিত বেতন পান; চাকরির নিশ্চয়তা নেই, তাঁর কাছ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রত্যাশা করা কঠিন।

আমাদের সংবাদমাধ্যমে বেতন ও চাকরির নিরাপত্তায় বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। সংবাদপত্রে ওয়েজ বোর্ড থাকলেও তা পুরোপুরি মানা হয় না; সম্প্রচার ও অনলাইনের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামোই নেই। ফলে একই পেশায় চরম বৈষম্য বিরাজ করছে এবং দক্ষ কর্মীরা পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। গণমাধ্যম কমিশনের উচিত শ্রম আইন ও পেশাগত অধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন তদারক করা। তবে প্রতিটি মাধ্যমের রাজস্ব ব্যবস্থা আলাদা হওয়ায় অভিন্ন বেতন কাঠামোর পরিবর্তে খাতভিত্তিক, বাস্তবসম্মত ন্যূনতম আর্থিক মানদণ্ড নির্ধারণ অধিক ফলপ্রসূ হবে।

ঙ. মালিকানা, অনুমোদন ও বিজ্ঞাপন
সংবাদমাধ্যমে অর্থায়নের উৎস, মালিকানা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের তথ্য উন্মুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়। রাজনৈতিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমের অনুমোদন দেওয়ার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে। নতুন লাইসেন্স বা নিবন্ধনের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি বিজ্ঞাপন বরাদ্দেও স্বচ্ছ নীতিমালা থাকা জরুরি। প্রচার সংখ্যা ও দর্শকপ্রিয়তা নিরূপণে স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য অডিট ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।

চ. কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া ও স্বাধীনতা
আইনে স্বাধীন বলাই যথেষ্ট নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে কোন কমিশন বাস্তবে কতটা স্বাধীন। খোদ কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ মানদণ্ডভিত্তিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। স্বার্থের সংঘাত এড়াতে মিডিয়া মালিক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক পদধারীদের কমিশনে রাখা যাবে না।
কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বাজেটের ওপর নির্ভরশীল না রেখে সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন ফি, লাইসেন্স নবায়ন ফি এবং সংসদীয় সংবিধিবদ্ধ বরাদ্দের মাধ্যমে নিজস্ব তহবিল নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের কাছে কমিশনের আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিতে তহবিলের নিয়মিত স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ছ. প্রশ্নটি স্বাধীনতা ও জবাবদিহির
কেবল কমিশন গঠন করলেই বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য। কমিশনের মূল দর্শন হওয়া উচিত: নিয়ন্ত্রণ নয়, স্বনিয়ন্ত্রণ; সেন্সরশিপ নয়, জবাবদিহি; প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা।

মো. মশিহুর রহমান: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

আরও পড়ুন

×