ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

মাটির সঙ্গে মিশে গেছে বাসুড়া বাজার সড়ক

মাটির সঙ্গে মিশে গেছে  বাসুড়া বাজার সড়ক
×

সড়কে জমে আছে পানি, পানি মাড়িয়ে চলতে হয় স্থানীয়দের সমকাল

 জহিরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর ফুলগাজী (ফেনী) 

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের  ২০টি গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাসুড়া বাজার। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এ বাজার ঘিরে প্রসারিত হয়েছিল ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু কালের পরিক্রমায় নানা সমস্যায় বাজারটি হারিয়ে গেছে। বাজারে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কারের অভাবে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণেই মূলত বাসুড়া বাজারটি বন্ধ হয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের মত।
স্থানীয়রা জানান, স্বাধীনতার পর ফুলগাজী উপজেলা সদর বাজারের সম্প্রসারণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র পরিবর্তনের ফলে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায় বাসুড়া বাজার। একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী এই বাজার। তবে বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাসুড়া গ্রামের প্রায় ৩০টি পরিবার এখনও বসবাস করছে সেখানে। তাদের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা দুই কিলোমিটার দীর্ঘ বাসুড়া বাজার সড়ক।
সরেজমিন দেখা যায়, ফুলগাজী সদর বাজার থেকে ভারত সীমান্তবর্তী বেগম খালেদা জিয়া সড়কের করইয়া-বাসুড়া এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কের অধিকাংশ অংশই বর্তমানে ভাঙাচোরা। কোথাও কোথাও রাস্তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই কঠিন। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় রাস্তার মাটি সরে গিয়ে অনেক অংশ আশপাশের জমির সঙ্গে মিশে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকায় রাস্তার দুই পাশ দখল ও ক্ষয়ে গিয়ে এর প্রস্থও অনেক কমে গেছে।
বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ভয়াবহ বন্যায় সড়কটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার পানির প্রবল স্রোতে রাস্তার মাটি ধুয়ে যায় এবং চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরে একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থা সীমিত পরিসরে কিছু মাটি ফেলে এবং হাঁটার সুবিধার্থে ইটের সলিং নির্মাণ করে। কিন্তু পরবর্তী বন্যায় সেই ইট ও মাটিও ভেসে যায়।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামের শিশু শিক্ষার্থীরা। বর্ষা মৌসুমে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে তাদের স্কুল ও মাদ্রাসায় যেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের কোলে করে শিশুদের রাস্তার উপযোগী স্থানে পৌঁছে দিতে হয়। আবার ছুটির পর একইভাবে তাদের বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘বাসুড়া বাজারকে কেন্দ্র করেই এখানে বসতি গড়ে উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বন্যায় রাস্তা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বহুবার গিয়েছি। সবাই আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। নির্বাচনের সময় অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে কেউ আর খোঁজ নেয় না।’
স্থানীয়রা জানান, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দিনমজুর, রিকশাচালক ও ভ্যানচালক।  অসচ্ছলতার কারণে তারা নিজেরা রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারছেন না। ফলে বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে ফুলগাজী উপজেলা প্রকৌশলী আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘সড়কটির বিষয়ে আমরা অবগত আছি। দীর্ঘদিন ধরে পাকা না হওয়ায় এবং বন্যার কারণে রাস্তার মাটি সরে গিয়ে এটি প্রায় জমির সঙ্গে মিশে গেছে। বর্তমানে নতুন আইডির আওতায় এনে সড়কটি পুনর্গঠন করতে হবে। তবে বর্তমানে আমাদের কাছে মাটির কাজের কোনো প্রকল্প না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।’
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহরিয়া ইসলাম বলেন, ‘গত অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া মাটির কাজের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আগামীতে নতুন বরাদ্দ পাওয়া গেলে অবহেলিত বাসুড়া বাজার সড়কের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। দ্রুত সংস্কার করা না হলে ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের স্মৃতিবাহী বাসুড়া বাজার সড়কের শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়ে যাবে। একই সঙ্গে কয়েক দশক ধরে বসবাসরত শতাধিক মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। সড়ক সংস্কারে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন

×