বিভাগে শিক্ষক থাকার কথা ১২ জন, অথচ পদই আছে ৪টি
দিঘির কোলে ৬৪ বছরের পুরোনো পটিয়া সরকারি কলেজ। দৃষ্টিনন্দন এ ক্যাম্পাসে রয়েছে অনেক সমস্যা সমকাল
আহমদ উল্লাহ, পটিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সকাল সাড়ে ৯টা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক থেকে হেঁটে কিংবা রিকশায় একে একে পটিয়া সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করছেন শত শত শিক্ষার্থী। কেউ এসেছেন আনোয়ারা থেকে, কেউ বোয়ালখালী, কেউ সাতকানিয়া, আবার কেউ চট্টগ্রাম শহর থেকে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লাসে পৌঁছালেও তাদের জন্য অপেক্ষা করে কষ্টকর বাস্তবতা– কখনও শিক্ষক নেই, কখনও শ্রেণিকক্ষের সংকট। ফলে পাঠদান চলে অনিয়মিত। কখনও একই কক্ষে একাধিক বর্ষের ক্লাস চলে। দুপুরে খাবারের জন্য নেই কোনো ক্যান্টিন, আর দূরবর্তী শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য নেই হোস্টেল।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার অন্যতম ভরসা পটিয়া সরকারি কলেজ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৮০ সালে সরকারীকরণ হওয়া কলেজটিতে বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি (পাস), ১১টি বিষয়ে অনার্স এবং দুটি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও অবকাঠামো না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন জানা যায়, কলেজের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই শিক্ষক সংকট রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী একটি অনার্স বিভাগে অন্তত সাতজন এবং মাস্টার্স বিভাগে ১২ জন শিক্ষক থাকার কথা। অথচ অধিকাংশ বিভাগে অনুমোদিত পদই মাত্র চারটি, যার মধ্যেও একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
সবচেয়ে বেশি সংকট বাংলা বিভাগে। চারটি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র একজন সহযোগী অধ্যাপক শামসুন নাহার খানম দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিই উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি (পাস) ও অনার্স– তিন স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছেন। ইংরেজি বিভাগেও চারটি পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন সহকারী অধ্যাপক ও দুজন প্রভাষক। অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, প্রাণিবিদ্যা ও কৃষিশিক্ষাসহ প্রায় সব বিভাগেই একই চিত্র। ফলে একজন শিক্ষককে একাধিক বর্ষের ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। কলেজ সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে চারজন অধ্যাপক (ইনসিটু), ১৪ জন সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু ও সংযুক্ত), ১৭ জন সহকারী অধ্যাপক (ইনসিটু ও সংযুক্ত), ১৯ জন প্রভাষক, দুজন প্রদর্শক এবং একজন সহকারী লাইব্রেরিয়ান কর্মরত আছেন। তবে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর তুলনায় এ জনবল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যাও প্রকট। পর্যাপ্ত একাডেমিক ভবন ও শ্রেণিকক্ষ না থাকায় অনেক সময় একই কক্ষে একাধিক শিফটে ক্লাস নিতে হয়। নিয়মিত রুটিন অনুসরণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সেমিনার রুম, গবেষণার পরিবেশ, ছাত্রদের কমনরুম কিংবা শিক্ষকদের ডরমিটরিও নেই।
সবচেয়ে বড় ভোগান্তি পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে। কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পটিয়ার বাইরের উপজেলা ও চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করেন। অথচ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজের নিজস্ব কোনো বাস নেই। ফলে অতিরিক্ত ভিড়ের গণপরিবহনে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে অবস্থান করলেও নেই কোনো ক্যান্টিন। খাবার কিংবা বিশুদ্ধ পানির জন্য বাইরে যেতে হয়, এতে ক্লাসও মিস হয় অনেকের।
আবাসন সংকটও দীর্ঘদিনের। কলেজে ছাত্র বা ছাত্রীদের জন্য কোনো হোস্টেল নেই। ফলে দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা যাতায়াতে ব্যয় করতে হয়। অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে মেসে থাকেন। দীর্ঘদিনের পুরোনো প্রশাসনিক ভবনটিও আধুনিক প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযোগী নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কলেজ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পটিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সুচক্রদণ্ডী এলাকায় দানকৃত তিন শতক জমি কলেজের নামে রয়েছে। সেখানে হোস্টেল কিংবা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে বিদ্যমান সংকটের কিছুটা সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার বলেন, ‘শিক্ষক কম থাকায় অনেক সময় নির্ধারিত ক্লাস হয় না। একজন শিক্ষককে একাধিক বর্ষের ক্লাস নিতে হয়। এতে আমাদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।’ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোছলেম উদ্দিন বলেন, ‘সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কলেজে থাকতে হয়। কিন্তু ক্যান্টিন নেই। খাবার বা পানির জন্য বাইরে যেতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা, কলেজের নিজস্ব বাস না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হয়।’
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনুভা জান্নাত বলেন, ‘আমরা অনার্সে পড়ি, অথচ একটি আধুনিক সেমিনার রুমও নেই। রেফারেন্স বই নিয়ে বসে পড়ার মতো পরিবেশের অভাবে গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করা শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন বলেন, ‘কলেজে হোস্টেল থাকলে প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হতো না। সেই সময় পড়াশোনায় কাজে লাগানো যেত।’
- বিষয় :
- কলেজ