বাঁশখালী
মাছচাষিদের মাথায় হাত, ক্ষতি ৫১ কোটি টাকার
ছবি: সংগৃহীত
আহমদ উল্লাহ, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) থেকে ফিরে
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বাঁশখালী উপজেলায় ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন মাছচাষিরা। আহরণের ঠিক আগমুহূর্তে বেড়িবাঁধ ভেঙে চিংড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বঙ্গোপসাগরে ভেসে গেছে। বিনিয়োগ হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন মাছচাষিরা। উপজেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৫১ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
ছনুয়ার মধুখালী এলাকার দুটি পানি নিষ্কাশন গেটের একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় বন্যার পানি দ্রুত নামতে পারেনি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁশখালী উপবিভাগের প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, ‘অচল স্লুইসগেটের কারণে বসতবাড়ির পাশাপাশি মাছের ঘের ও কৃষিজমিও দীর্ঘ সময় পানির নিচে ছিল।’
সম্প্রতি সরেজমিন উপজেলার ছনুয়া, গন্ডামারা, শেখেরখীল, সরল ও খানখানাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ মাছের ঘের এখনও পানির নিচে। কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে, কোথাও অচল স্লুইসগেটের কারণে পানি নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এতে কোটি কোটি টাকার মাছ ও চিংড়ি ভেসে গেছে।
বাঁশখালীর অর্থনীতির বড় অংশই মাছ ও লবণ চাষনির্ভর। বছরে ছয় মাস মাছ এবং ছয় মাস লবণ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয়রা। কিন্তু চলতি মৌসুমে মাছ বিক্রির ঠিক আগে আকস্মিক বন্যা তাদের সব হিসাব-নিকাশ এলোমেলো করে দিয়েছে।
ছনুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাছচাষি আমিনুর রহমান বলেন, ‘৩৫ একর ঘেরে চিংড়ি, গলদা, কোরাল ও টেংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষে প্রায় দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। এর মধ্যে ৬০ লাখ টাকা ঋণ। ১২ দিন ধরে ঘের পানির নিচে। সব মাছ সাগরে চলে গেছে। সরকারি সহায়তা না পেলে ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না।’ একই এলাকার ঘের মালিক সরওয়ার জানান, ৮০ একর জমিতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ করে চিংড়ি চাষ করেছিলেন। আরও দুই মাস পর বিক্রি করলে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা পাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু সব ভেসে গেছে। এখন ঋণের কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
মাছচাষি আবুল কালাম বলেন, ‘১৫ বছর ধরে মাছ চাষ করছি। এবার বেড়িবাঁধ ভেঙে সব মাছ সাগরে চলে গেছে। নিজেদের উদ্যোগে বাঁধ মেরামত করেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি।’ একই এলাকার শোয়েব বলেন, ‘এক কানি জমি ভাড়া নিয়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে মাছ ও চিংড়ি চাষ করেছিলাম। বন্যার পানিতে সব ভেসে গেছে।’ শেখেরখীল ইউনিয়নের পোনাখালী এলাকার চাষি আবদুল মজিদ জানান, প্রায় চার লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা ছেড়েছিলেন ঘেরে। আড়াই মাস বয়স হয়েছিল মাছের। সব পানিতে ভেসে গেছে। সরকারি প্রণোদনা পেলে আবার নতুন করে শুরু করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ৩১০টি চিংড়ি ঘের ও ৪ হাজার ২০০টি মাছের পুকুর-দিঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৮৫৪ দশমিক ৭৩ শতক চিংড়ি ঘের এবং ১৬ হাজার ৩৮০ দশমিক ৫৭ শতক পুকুর ও দিঘির জলাশয়। এতে প্রায় ৯৮৩ দশমিক ৩৩ মেট্রিকটন মাছ এবং ৫৬৩ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন চিংড়ি ভেসে গেছে। এখনো অনেক এলাকায় পানি না নামায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাঁশখালী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌসিব উদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মৎস্য খাতে প্রায় ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পানি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তার সুপারিশও করা হবে।’
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও স্লুইসগেট দ্রুত সংস্কার না হলে বাঁশখালীর মৎস্য খাত দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে।