পরিশ্রম ও একাগ্রতায় রেনেসাঁর সাফল্য
রেনেসাঁ চাকমা
সত্রং চাকমা
প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫০ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ২১:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
টিউশন থেকে জমানো মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে রেনেসাঁ চাকমা শুরু করেছিলেন ‘টুকিটাকি’ নামে অনলাইন ব্যবসা। এটি এখন এক নামে পরিচিত। টুকিটাকি এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা। বর্তমানে তাঁর হাতে গড়া বিভিন্ন ভেষজ ও ড্রাই ফুডের প্রতিষ্ঠানটিতে ছয়জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাঁর এ যাত্রাপথ সহজ ছিল না। অনেক চড়াই-উতরাই ও বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে দাঁড় করিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটি। আগামী দিনে টুকিটাকিকে তিনি অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।
রেনেসাঁ চাকমা রাঙামাটি শহরের অদূরে রাঙ্গাপানি গ্রামে একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারান। সেই ছোটবেলা থেকে অনেক সংগ্রাম করে পড়াশোনা করেছেন। মায়ের অল্প আয়ে সংসার চালানো কষ্টের বিধায় এইচএসসি পাস করেই টিউশনি শুরু করেন। কিন্তু ২০২০ সালে করোনাকালে তাঁর জীবন স্তব্ধ হয়ে পড়ে। তিনি উপলব্ধি করেন, ঘরে বসে আয় করার রাস্তা বের করতে হবে। এরই মধ্যে তিনি মাস্টার্স শেষ করেন।
রেনেসাঁ চাকমার ইচ্ছে ছিল একজন চিকিৎসক হয়ে মানবসেবা করার। সেই লক্ষ্যে মেডিকেল কোচিংয়ে ভর্তি হন। আর্থিক অবস্থার কারণে শেষ করতে পারেননি। পরে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে অনার্সে ভর্তি হন রাঙামাটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। কিন্তু পড়াশোনায় মন দিতে পারছিলেন না। কারণ যেখানে থাকতেন সেখানে ঠিকমতো খেতে পেতেন না। চিন্তা করেছিলেন একদিন কাউকে না বলে সেখান থেকে পালিয়ে যাবেন। কারণ পেটে ক্ষুধা নিয়ে পড়াশোনা করা যায় না। তারপরও তিনি হার মানেননি। উদ্ভিদবিদ্যায় ভালোবাসার উপায় খুঁজতে খুঁজতেই বিভিন্ন ভেষজ উপাদান দিয়ে কাজ শুরু করেন।
২০২০ সালে তিনি প্রথম নিমপাতা আর কাঁচা হলুদ দিয়ে নিম ফেসিয়াল ক্লিনজার তৈরি করেন। এতে বেশ পরিচিতি পান। একের পর এক পণ্য বাড়তে থাকে। একে একে তুলসী ফেসিয়াল ক্লিনজার, চারকোল ফেসিয়াল ক্লিনজার, বিভিন্ন ফেশপ্যাক, হেয়ারপ্যাক ও হেয়ারঅয়েল তৈরি করতে থাকেন। পরে সিজনাল ড্রাই ফ্রুটসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য শুকিয়ে তা অনলাইনে বিক্রি করতে থাকেন। তার মধ্যে রয়েছে শুকনো আনারস, শুকনো পেঁপে, মিক্সড ড্রাই ফ্রুটস, আচার, কাজুবাদাম, আনারসের লাড্ডু ইত্যাদি। একদিন এক সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমাকে তাঁর তৈরি করা বিভিন্ন ইউনিক প্রডাক্ট দেখান। পরে উপদেষ্টা পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত বাজেট থেকে আর্থিক সহায়তা করেন বিভিন্ন মেশিন কেনার জন্য। এসব মেশিন দিয়ে এখন ভেষজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য তৈরি করছেন। এ ছাড়া রেনেসাঁ চাকমা থাইল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর আদিবাসী পাহাড়িদের জনপ্রিয় খাবার চিদোল স্বাস্থ্যকরভাবে তৈরি করে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। রেনেসাঁ ইতোমধ্যে তাঁর সফলতার জন্য ২০২২ সালে স্মার্ট নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার, ২০২৫ সালে আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার, একই বছরে চিটাগং চেম্বার অব কমার্সের নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন। কৃষিপণ্য নিয়ে থাইল্যান্ড থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষে রাঙামাটি, বান্দরবান আর চট্টগ্রামের ওমেন চেম্বার অব কমার্সে ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে সারাদেশে তাঁর ৬০০ প্রশিক্ষণার্থী আছে।
তিনি জানান, ২০২২ সালে সাবাংগী নেটওয়ার্ক নামে এক নারী উদ্যোক্তা গ্রুপের সঙ্গে জায়গা ভাড়া করে তাঁর উদ্যোগ টুকিটাকির নিজস্ব দোকান চালু করেন। বাসাতেই সব পণ্য তৈরি করতেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছোট্ট একটি কারখানা স্থাপন করেছেন, যেখানে এখন সব পণ্য তৈরি হচ্ছে। কারখানা স্থাপন করার পরও আনুষঙ্গিক খরচ, বিভিন্ন মেশিন দরকার ছিল, যা তাঁর কেনার সামর্থ্য ছিল না। তবে তিনি পরিশ্রমী। নিজের লক্ষ্যে অটুট থাকায় সরকারি-বেসরকারিভাবে অনেক সুযোগ পেয়েছেন, যা তাঁকে ঘুরে দাঁড়াতে সহযোগিতা করেছে। এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চান।
তাঁর ভাষ্য, ‘অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এ স্থানে আসতে হয়েছে। পরামর্শ দেওয়ার কেউ ছিল না। তবে যোগ্যতা, পরিশ্রম আর মনোবল ছিল বলেই সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এ ব্যবসা করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হলেও ঋণখেলাপি হইনি। এ ক্ষেত্রে অনেকের সহযোগিতা পেয়েছি।’
- বিষয় :
- নারী উদ্যোক্তা
- রাঙামাটি
