কর্মক্ষেত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়
নারীরা কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন, কর্মবিরতির পরও তারা ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সক্ষম
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের সমাজে একজন পুরুষের কর্মজীবনে বিরতি নেওয়াকে অনেক সময়ই ‘সাবাটিকেল’ বা নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সময় হিসেবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাতৃত্ব, সংসার বা অন্য কোনো পারিবারিক কারণে একবার কর্মক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়লে, ধরে নেওয়া হয় তার পেশা জীবনের সেখানেই ইতি ঘটেছে। ফের কর্মক্ষেত্রে ফেরার চেষ্টা করলে সমাজ, এমনকি নিয়োগদাতারাও বাঁকা চোখে তাকান। এই অদৃশ্য শিকল আর সামাজিক নেতিবাচকতার অচলায়তন ভেঙে নারীকে পুনরায় সগৌরবে কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিয়েছে। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত
------------------------------------------------------------------------
এলিজাবেথ মারান্ডির গল্পটি আমাদের চারপাশের অসংখ্য লড়াকু নারীর প্রতিচ্ছবি। দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থায় মাঠপর্যায়ে কাজ করার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর ঝুলিতে। ২০১৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান বিদেশে। দেশে ফিরে নওগাঁ ও রাজশাহীতে একটি বেসরকারি সংস্থায় প্রকল্প সমন্বয়কারী হিসেবে নিজের দক্ষতার প্রমাণ রাখেন। এরপর ২০২২ সালে দিনাজপুরের বিরামপুরে স্বামীর সঙ্গে মিলে নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও পণ্য তৈরির ব্যবসায় যুক্ত হন। একটা সময় পর আর্থিক ও পেশাগত আত্মপরিচয়ের তাগিদে পুনরায় প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে ফিরতে চান এলিজাবেথ। তখনই তিনি মুখোমুখি হন বাংলাদেশের করপোরেট সংস্কৃতির রূঢ় বাস্তবতার। এলিজাবেথ বুঝতে পারছিলেন, দীর্ঘ বিরতির পর ফেরাটা মসৃণ হবে না।
এলিজাবেথের ভাষায়, ‘চাকরি থেকে একজন নারীর বিরতি নেওয়াকে কখনোই ভালো চোখে দেখা হয় না। পদে পদে কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অবলীলায় ধরে নেওয়া হয়, মেয়েটি কোথাও চাকরি পাচ্ছে না দেখেই হয়তো মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে।’ নিজের আত্মবিশ্বাসও তলানিতে ঠেকেছিল তাঁর। পুরোনো দক্ষতায় বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পারবেন কিনা, সেই দ্বিধা তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। ঠিক সেই অন্ধকার সময়েই ব্র্যাকের ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ তাঁর সামনে উন্মোচন করে নতুন দিগন্ত। সব ধাপ পেরিয়ে নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে তিনি ব্র্যাকের মাইক্রোফাইন্যান্স বিভাগে ‘সিনিয়র অফিসার’ হিসেবে কাজ করছেন।
এলিজাবেথের মতো লাখো নারী যোগ্যতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও কেবল দীর্ঘ বিরতির কারণে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করতে পারেন না। বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য এটি একটি অশনিসংকেত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপের দিকে তাকালে হতাশার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। দেশে শ্রমশক্তিতে পুরুষের অংশগ্রহণের হার যেখানে প্রায় ৭৯ শতাংশ, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০ শতাংশে। অথচ ২০২৩ সালেও এই হার ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ, নারীরা কর্মমুখী হওয়ার বদলে উল্টো শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৪ সালের জুনে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক জেন্ডার অসমতা’ প্রতিবেদন বলছে আরও ভয়াবহ কথা। অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন–এই চার সূচকে গত পাঁচ বছরে শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষের বৈষম্য তো কমেইনি, বরং আয়ের ক্ষেত্রে এই অসমতা বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ! নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন যে নিছকই কথার কথা, তা এই পরিসংখ্যানগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ব্র্যাকের রিটার্নশিপ কর্মসূচির আবেদন প্রক্রিয়া থেকে পাওয়া উপাত্ত নারীদের কর্মজীবন থেকে ছিটকে পড়ার প্রকৃত কারণগুলো নিখুঁতভাবে তুলে এনেছে। আবেদনকারীদের ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশই জানিয়েছেন, পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। মাতৃত্বকালীন সময়ের জটিলতা ও সন্তান লালন-পালনের জন্য চাকরি ছেড়েছেন ৩৬ শতাংশ নারী। অর্থাৎ, সমাজের অবৈতনিক পরিচর্যার সিংহভাগ দায়ভার কেবল নারীর কাঁধেই বর্তায়। এর বাইরে ব্যক্তিগত কারণ (১৮.৮ শতাংশ), উচ্চশিক্ষা (১৪.৪ শতাংশ), বিরূপ ও নারীবান্ধব নয় এমন কর্মপরিবেশ (৮.৫ শতাংশ) এবং সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপ (৪.৭ শতাংশ) নারীর ক্যারিয়ারের পথে বড় অন্তরায়।
সবকিছু ছাপিয়ে এই নারীরা যখন পুনরায় ফিরতে চান, তার পেছনে কেবলই কি অর্থোপার্জন কাজ করে? তথ্য বলছে, না। বিরতির পর কাজে ফেরার ক্ষেত্রে তাঁদের মূল অনুপ্রেরণা হলো–ক্যারিয়ারে উন্নতি (৭৬.৫ শতাংশ), নিজস্ব আত্মপরিচয় বা আইডেনটিটি তৈরি (৬২.২ শতাংশ), হারানো আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার (৫৭.৭ শতাংশ), আর্থিক স্বাধীনতা (৫৬.৫ শতাংশ) এবং পরিবারের অর্থনীতিতে অবদান রাখা (৪২.৭ শতাংশ)। সর্বশেষ আসরে মাত্র ২৬টি পদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ১২০০-এর বেশি! কয়েক ধাপে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত এই ২৬ জন নারী আগামী ছয় মাস ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কাজ করবেন।
এটি নিছক কোনো অবৈতনিক ইন্টার্নশিপ নয়। নির্বাচিত প্রার্থীরা সম্মানজনক বেতন পাবেন। পাশাপাশি তাঁরা ব্র্যাকের অভিজ্ঞ পেশাদারদের কাছ থেকে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পাবেন। সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো ‘মেন্টরশিপ’। দীর্ঘ বিরতির কারণে যে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, তা কাটিয়ে উঠতে পেশাগত কাউন্সেলিং, প্রযুক্তিগত জ্ঞান হালনাগাদ করা এবং নেতৃত্ব উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এখানে।
আট বছর চাকরি করার পর একান্তই পারিবারিক কারণে ক্যারিয়ারে ইস্তফা দিয়েছিলেন ফারাহ মাহবুব। আট বছর করপোরেট দুনিয়া থেকে দূরে থাকা মানে একটি যুগের পরিবর্তন। এক বছরের কিছু বেশি সময় পর তিনি নিজের হারানো আত্মপরিচয় খুঁজতে পুনরায় চাকরিতে ফেরার চেষ্টা করেন। অভিজ্ঞতা থাকার পরও বিরতির কারণে ডাক পাচ্ছিলেন না কোথাও।
অবশেষে ব্র্যাকের ব্রিজ রিটার্নশিপ তাঁকে সেই সুযোগ করে দেয়। বর্তমানে তিনি ব্র্যাকের ‘সোশ্যাল ইনোভেশন ল্যাব’-এ ডেপুটি ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন। ফারাহ বলেন, ‘নারীর চাকরিতে বিরতির বিষয়টিকে আমাদের সমাজে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। রিটার্নশিপ কর্মসূচি আমাকে সেই অদৃশ্য বাধা পেরোতে সাহায্য করেছে। আমি নিজের কাজ দেখানোর একটি সুষ্ঠু প্ল্যাটফর্ম পেয়েছি।’
ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর বলেন, ‘কাজ থেকে বিরতি নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। বরং একটি প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার থেকে সরে দাঁড়ানো অনেক বড় সিদ্ধান্ত এবং সাহসের ব্যাপার। পেশায় বিরতি মানেই দক্ষতার অভাব বা মেধার মৃত্যু নয়। প্রতিভাবান নারীকে আবারও পেশাজীবনে ফিরতে, নেতৃত্ব দিতে এবং প্রভাব বিস্তারে সুযোগ তৈরি করতেই আমাদের এই ব্রিজ রিটার্নশিপ।’
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য হলো–‘গিভ টু গেইন’। অর্থাৎ, অর্জনের জন্য বিনিয়োগ করা। নারীর প্রতি সেই বিনিয়োগ হতে পারে জ্ঞান, অবকাঠামো, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং কিংবা সময়। ব্র্যাকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঠিক সেই কাজটিই করছে।
তবে ব্র্যাক ক্ষেত্রটি আরও বিস্তৃত করেছে। শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠানেই নয়, ব্র্যাক এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য এনজিও এবং শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনেও সহায়তা করছে। এমনকি কেউ যদি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের ভাগ্য গড়তে চান, তবে সেখানেও ব্র্যাক তাদের দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
- বিষয় :
- নারী
- শাহেরীন আরাফাত
- কর্মক্ষেত্র
- কর্মজীবী নারী
