পালাগানে নারীর মর্মবেদনা
নারীর মন চিরকালীন বাপের বাড়ির কাঙাল
ইমরান উজ-জামান
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘তোরা কে যাসরে ভাটির গাঙ বাইয়া আমার ভাইজানরে কইও নাইওর নিত আয়া, কে যাস, কে যাস...।’
স্বামীর বাড়ির ঘরকন্যার কাজ শেষ করে অলস দুপুরে দুদণ্ড সময় পেলে মন চলে যায় বাপের বাড়ি। বাড়ির ঘাটের শিরীষ অথবা বরুণ গাছের গুঁড়িতে থুতনি রেখে মনের গহিন থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। কণ্ঠে ভাসে দূর ভাটির মাঝির উদ্দেশ্যে আকুতি। শচীন দেব বর্মণের এই গানে হাওরের নারীর অব্যক্ত কথামালা গানে প্রকাশিত। এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, গানে ভাইকে মনে করেছে, বোনকে নয়। কারণ বোন হয়তো ইতোমধ্যে অন্য কারও ঘরনি। হাওরের নারীর ভাবনায় বাপের বাড়ির আরও প্রমাণ আছে–
‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে পুবালি বাতাসে বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি আমার নি কেউ আসে রে।’
তবে উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়াতে নারী মনের আকুতির প্রকাশেও সেই চিরকালীন যাতনাই প্রকাশিত–
‘ও কি ও বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে কোন দিন আসিবেন বন্ধু কয়া যাও কয়া যাও রে।’
আধুনিক পালা গানেও কিন্তু সেই চিরকালীন নারী মনের কামনা পাওয়া যায়,
‘আমার ঘুম আসে না রে একা ঘরে শুইলে তোমরা নি দেখেছো আমার শ্যামগোকুলে।’
নববিবাহিত বধূ তো বটেই, বয়সী নারীর কাছেও শ্বশুরবাড়ি চিরকালই শ্বশুরবাড়ি। বাপের বাড়ির জন্য টানটা তাঁর থাকে আমৃত্যু। সন্তানাদি নিয়ে বাস করে শ্বশুরবাড়ি বা তাঁর স্বামীর বাড়ি। তিনি কখনও উচ্চারণ করেন না এটা তাঁর বাড়ি। সন্তানের নাম করে বলেন, ওদের বাড়ি। অথবা বলেন শ্বশুরবাড়ি। নিজের বাড়ি বলতে বাপের বাড়িকেই বোঝান নারীরা।
আমার বাবাজুর দেশে না যাইতে উঁচা নেচা মাটি হায় গো কোন পন্থে যাইবা হায় গো সাধু আমার বাবাজুর দেশে।
‘লিলুয়া সুন্দরীর পালা’ গীতিনাট্যে বাপের বাড়ির মাহাত্ম্য এভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। এখানে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে থাকতে লিলুয়া সুন্দরীর মনের ভেতরে বাপের বাড়ি যাওয়ার পথ বন্ধুর হয়ে পড়েছে।
নারীর মন চিরকালীন বাপের বাড়ির কাঙাল। ‘লিলুয়া সুন্দরীর পালা’ ধরেই যদি আলোচনা করা যায়, এই গীতিনাট্যের প্রথম দিকে লিলুয়া সুন্দরী যৌবনে অতি মনোরম আবেশে নিজের সওদাগর বাড়িতে বাস করে। ‘দক্ষিণ দুয়ারের ঘরে বাস বাড়ির আদরের একমাত্র কন্যা লিলুয়ার।’ বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ও মনোরম উত্তর বান্ধের ষোলটঙ্গির দক্ষিণ দুয়ারী ঘরে বাস মেয়ের। সাত ছেলে থাকতে মেয়ে লিলুয়া সুন্দরীর জন্যই বরাদ্দ এই বিশেষ ঘর।
ভাটির সওদাগর বাড়ির আদরের কন্যা একসময় চলে যায় ভাটির দেশের বউ হয়ে। এই ভিনদেশে যাওয়াটাও তার জন্য যাতনা। স্বামী বাড়ি যাওয়ার প্রাক্কালে সে বলে,
‘দূর ঐ দেশে বিয়া না দিছেন গো বাবাজান কী কী দিবেন? কী কী দিবেন সাথে তে?’
বাবা যা দেবেন বলে মনস্থির করেছেন–
‘গাইও দিলাম বাছুরও দিলাম, রাখাইল্যা দিলাম–রাখাইল্যা দিলাম সাথে তে।’
লিলুয়া সুন্দরীর কিন্তু গাই-বাছুর এর চাইতে অন্য কিছু বেশি দরকার–
‘গাইও চাই না, বাছুরও চাই না গো বাবাজান, ভাইয়ে কি যাইবো–ভাইয়ে কি যাইবো সাথে তে।’
শ্বশুরবাড়ি যেতে এতটাই একাকিত্বে ভুগছে লিলুয়া, সে তার ভাইকে সঙ্গে নিতে চাইছে। কিন্তু তাকে একাই যেতে হয় স্বামীর বাড়ি, দূরের দেশে। বিবাহিত স্বামী আর পরবাসী মন নিয়ে তার যাতনায় কাটে দিবানিশি।
‘কিনা জঞ্জাল ঘটাইলো বিবির মায়গো দুয়ারে দনিচা রুইয়া হে। সেই না দনিচার বাসকমার পুইনার বেটা উনিয়া ঘামিয়া পরে হে।’
এই গানে বাড়িতে মোক্ষম বৃক্ষরোপণের ভাবনাটাও পাওয়া যায়; যা কিনা নারীর প্রকৃতি প্রীতি ও প্রকৃতি ভাবনার উদাহরণ। তবে নারীমনের পরম বন্ধু তার স্বামী। এর ব্যতিক্রম হলেই বাঙালি সমাজে গোল বাধে। পরিবারে হয় অশান্তি। কাজেই এই আলোচনা বাঙালি নারী মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ–এটা বলতে হবে। এই যেমন ইউরোপ-আমেরিকায় বিয়ে বা কারও সঙ্গে একসঙ্গে বসবাসের জন্য কোনো নিয়ম মানা জরুরি নয়।
আমাদের বঙ্গে স্বামী পরম গুরু, স্বামী একজন নারীর ঠিকানা। শত অনাচারেও পুরুষের জাতি-কুলে দাগ লাগে না। সামান্য ভুলেই নারীর জাত-কুল-মান চলে যায়। কাজেই নারী জীবনভর বাস করেন এক বিপদসংকুল বন্ধুর পর্বতে।
নারীমনের চিরকালীন সাধনার ধন তার স্বামী। জন্ম থেকে ষোড়শী বা কুড়ি বছর পর্যন্ত যে পরিবেশে, আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠে সে জায়গা সে ছেড়ে যায় এক স্বপ্নের পুরুষের সঙ্গে। সেই পুরুষ তার পরম সাধনার ধন। বাপের বাড়ি তো বটেই, সবখানে তার স্বামীকে সে মাথায় তুলে রাখে। সে যদি অন্তরে তার ঘৃণার পাত্রও হয়, তবুও। তবে তার মর্মে জানান দেয়, তার প্রাণের আকুতি। যা সে তার নিজের কাছে লুকাতে পারে না।
যেমন–লিলুয়া সুন্দরীর বিয়ে হয় এক বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে। সে তার দামান মিলম রাজাকে জাতিকুল রক্ষায় মাথায় তুলে রাখে। তবে মনের ভেতর থাকে অন্য কথা। তার ভাবনায় বাস করে নির্মল, সুবোধ–একান্ত তার নিজের অবিবাহিত একজন পুরুষ। যে আদ্যোপান্ত তার। যে কদমের ফুলের মতো সতেজ আর সুন্দর।
পালা লিলুয়া সুন্দরীতে তাই লিলুয়া বাহ্যিকতায় সে একজন চিত্তহারা জীবনের অভিনয় করলেও। অন্তর জগতে তার, যাতনার ঘরে বসতি। তার দীর্ঘশ্বাসে তা প্রকাশিত।
‘হাঙ্গাইল্যা পুরুষ আমার জাতি আর কুল অবিয়াতো পুরুষ আমার কদমের ফুল।’
- বিষয় :
- নারী
- পালাগান
- গ্রামীণ নারী
