নিজেদের সঞ্চয়ে স্বপ্নের বিয়ে
সুপ্রভা-হাসিবের গল্প অনুপ্রেরণা জোগাবে অন্যদের
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্বর্ণের আকাশছোঁয়া দাম, পোশাকের চড়া বাজার আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি– সব মিলিয়ে একটি বিয়ের আয়োজন করতে গিয়ে ঋণ বা সম্পদ বিক্রির মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হয় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। সেখানে সুপ্রভা-হাসিব দম্পতির উদ্যোগ অনেকের কাছেই হতে পারে অনুপ্রেরণার।
--------------------------------------------------------
তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় এক দিনের অতিরঞ্জিত আনুষ্ঠানিকতায় ফুরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমাদের চারপাশে নেহাত কম নয়। যে নবদম্পতি নতুন জীবনের স্বপ্ন বুনবে, তাদের কপালে বিয়ের পরদিন থেকেই চিন্তার ভাঁজ পড়ে– কীভাবে শোধ হবে ঋণ।
তবে এ গড্ডলিকায় গা ভাসাতে চায় না– এমন তরুণও তো আছে। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নবদম্পতি সুপ্রভা হক ও হাসিব আহমেদ। পরিবারের ওপর খরচের বোঝা না চাপিয়ে জমানো টাকায় সম্পূর্ণ নিজেদের খরচে তারা সেরেছেন বিবাহোত্তর সংবর্ধনা বা রিসেপশনের আয়োজন।
বিন্দু বিন্দু সঞ্চয়ে স্বপ্নের বাস্তবায়ন
সুপ্রভার বাড়ি রংপুরে, হাসিবের নরসিংদীতে। কুয়েটে পড়তে গিয়ে প্রেম। ২০২৪ সালে পারিবারিকভাবে সুপ্রভা ও হাসিবের বিয়ের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এর পর থেকেই মাথায় ছিল রিসেপশনের চিন্তা। কিন্তু তারা দুজনেই একটি বিষয়ে একমত ছিলেন– এই আয়োজনের আর্থিক চাপ কোনোভাবেই পরিবারের ওপর দেওয়া যাবে না।
সুপ্রভা একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন আর হাসিব একটি প্রতিষ্ঠানের মার্চেন্ডাইজার। নিজেদের এ উদ্যোগের কথা জানাতে গিয়ে সুপ্রভা বলেন, ‘খরচের চাপটা আমরা পরিবারের ওপর দিতে চাইনি। সেই ভাবনা থেকেই দুজনের আয় থেকে একটু একটু করে টাকা জমাতে শুরু করি। কোনো মাসে পাঁচ হাজার, কোনো মাসে ১০ হাজার। এর সঙ্গে আমাদের উৎসব ভাতা (বোনাস) ও টিউশনির টাকাও যুক্ত করেছি। যখন দেখলাম, একটা সম্মানজনক পরিমাণ টাকা জমেছে, তখনই অনুষ্ঠানটি করার সাহস পাই।’
বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা
বিশাল আয়োজনের বদলে তারা জোর দিয়েছেন আন্তরিকতায়। তারা যেহেতু থাকেন মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরে, তাই রিসেপশনের জন্য বেছে নিয়েছেন মিরপুরেরই একটি কনভেনশন সেন্টার। সেখানে অতিথি ছিলেন ২০০ থেকে ২২০ জন। কেবল দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, বন্ধু, অফিসের সহকর্মী এবং কাছের সিনিয়র-জুনিয়রদের নিয়ে সাজানো হয়েছিল এ আসর। যারা আমন্ত্রণের বাইরে ছিলেন, তাদের ফোন করে দোয়া চেয়ে নিয়েছেন এই দম্পতি।
খরচ কমানোর কৌশল নিয়ে হাসিব বলেন, ‘করোনার পর থেকে যাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগটা সবচেয়ে নিবিড়, তাদেরই অগ্রাধিকার দিয়েছি। খরচ কমানোর সবচেয়ে বড় জায়গা হলো খাওয়া-দাওয়া আর ঘোরাঘুরি। আমরা গতানুগতিক হানিমুনে না গিয়ে সেই বাজেট বাঁচিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ ট্যুরে গিয়েছি।’
আলাদা কোনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মকে দায়িত্ব না দিয়ে নিজেদের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা তারা নিজেরাই করেছেন। কমিউনিটি সেন্টারের কর্মী এবং কাছের বন্ধুদের সহায়তায় পুরো আয়োজনটি হয়ে উঠেছিল ছিমছাম ও পরিপাটি। স্বর্ণের গহনা মানেই এখন লাখ লাখ টাকার ধাক্কা। কিন্তু সুপ্রভা প্রমাণ করেছেন, আভিজাত্য কেবল স্বর্ণে নয়, রুচিতেও থাকে। তিনি স্বর্ণের গহনার বদলে বেছে নিয়েছিলেন দেশীয় একটি ব্র্যান্ডের নান্দনিক মেটালের গহনা। সুপ্রভার মতে, ‘স্বর্ণের গহনা বিয়ের পর বেশির ভাগ সময়ই লকারে পড়ে থাকে; পরা হয় না। এর চেয়ে এই টাকাটা নতুন সংসারের অন্য কোনো দরকারে ব্যয় করা অনেক বেশি যৌক্তিক।’ পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তারা ছিলেন যথেষ্ট হিসাবি ও রুচিশীল।
ফটোগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফির ক্ষেত্রেও তারা দেখিয়েছেন দারুণ এক দৃষ্টিভঙ্গি। লাখ টাকা খরচ করে নামিদামি স্টুডিও ভাড়া না করে তারা সুযোগ দিয়েছেন তরুণদের। হাসিব বলেন, ‘ছবি তোলার জন্য আমরা কুয়েটের (খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) এক জুনিয়রকে দায়িত্ব দিই। এটি ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ওয়েডিং প্রজেক্ট। তিনি ভালোবেসে কাজটি করেছেন। আমাদের বিয়ের কাজটা করার পর তিনি বেশ কিছু নতুন কাজ পেয়েছেন।’ বিয়ের সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বেও ছিলেন আরেক তরুণ।
বিয়েতে ঋণের জাল
সুপ্রভা ও হাসিবের এই সাশ্রয়ী ও স্বনির্ভর বিয়ের আয়োজন সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছে। নেটিজেনরা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অনেকেই আক্ষেপ করে বলেছেন, বিয়ের অতিরিক্ত খরচের কারণে কীভাবে তারা ঋণের জালে আটকে গেছেন!
লেখক রাজীব হাসান তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘নিকট অতীতে যত বিয়েতে গেছি, খাবারের অপচয় দেখে খারাপ লেগেছে।
…টাকা তো বিষয় না, পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ আধপেট খেয়ে ঘুমাতে যায়। এই বিয়েতে অন্তত আমাদের টেবিলে কেউ খাবার অপচয় করেনি। আমরা পেটপুরে খেয়েছি। সুপ্রভা-হাসিবের জন্য দোয়া, শুভকামনা।’
বিয়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এখনকার বিয়েতে অপচয় অনেক বেশি। এই অপচয় সাংস্কৃতিকভাবে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে, মানুষ ঋণ করে হলেও অতিভোজ ও অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক করে। এর ফলে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। এখানে বড় ধরনের একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দরকার।’
বিয়েতে বেশি খরচ করলে টাকা বাজারে যুক্ত হয় এবং অর্থনীতিকে সক্রিয় করে– এমন যুক্তির বিপরীতে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় খরচ করলে কেনাবেচা বাড়ে ঠিকই, কিন্তু সেটা সমাজের জন্য কোনো টেকসই সমাধান দেয় না। গুটিকয়েক হল মালিক বা ক্যাটারিং ব্যবসায়ীর লাভ হলেও এই অপচয় পরিবার ও সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাসের একটি ভ্রান্ত উদাহরণ তৈরি হয়, যা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত।’
- বিষয় :
- বিয়ে
- রিক্তা রিচি
- জীবনের গল্প
