মায়ের মধুর হাসি – মা দিবসের বিশেষ আয়োজন
অটুট বন্ধনের আঁচল
মায়ের সঙ্গে মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:১১ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৬:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘মা’ কেবল একটি শব্দ নয়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নিবিড় ছায়ায় আমরা বেড়ে উঠি, তার কোনো তুলনা নেই– এক অনন্ত মমতার মহাকাব্য। নাড়ির বাঁধনে বোনা সেই অকৃত্রিম স্নেহের ঋণ কি কখনও শোধ করা যায়? বিশ্ব মা দিবসের বিশেষ আয়োজনে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। গ্রন্থনা শাহেরীন আরাফাত
-----------------------------------------------------
আমার মায়ের বয়স এখন ৯৩। সাড়ে বারো কী তেরো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। আমি তাঁর প্রথম সন্তান। তাই তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতাও অন্য ভাইবোনদের চেয়ে বেশি। আমার মা ‘রত্নগর্ভা’ পুরস্কার পেয়েছেন, যা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের।
আমরা চার ভাই, পাঁচ বোন। ভাইবোনদের জন্মের পর মায়ের স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি আমি দেখেছি। এতগুলো সন্তানের জন্ম ও লালন-পালন করা একজন মায়ের পক্ষে কতটা কঠিন, তা ভেবে আমার মনে গভীর সহানুভূতি জাগে।
মায়ের অনেক স্মৃতি আমাকে এখনও নাড়া দেয়। ছোটবেলায় একবার আমার বসন্ত হয়েছিল। সেই বিরক্তিকর অসুখে রাতে আমার ঘুম হতো না। মশারি টানিয়ে মা আমার পাশে বসে কাঁথা সেলাই করতেন আর গুনগুন করে গান গাইতেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর তিনি কখন ঘুমাতেন, তা আর জানা হতো না।
আমার কোনো আবদার থাকলে মা সবসময় দ্রুত তা পূরণ করার চেষ্টা করতেন। এ জন্য ভাইবোনদের কাছে আমি কিছুটা ঈর্ষার পাত্র ছিলাম। ছোটবেলায় মা খুব অসুস্থ থাকতেন। তখন গ্রামে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। টাঙ্গাইল শহর থেকে ওষুধ ও রিপোর্ট আনা-নেওয়ার কাজ আমি ছোট বয়সেই করতাম।
বাবা আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে খুব কড়া ছিলেন। আমি পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বাইরের অপাঠ্য বই বেশি পড়তাম, যা নিয়ে বাবার বকুনি খেতে হতো। মা তখন আমাকে বাবার শাসন থেকে বাঁচাতেন। আমার শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আগ্রহের পেছনে মায়ের পরিবারের, বিশেষ করে মামাদের বড় অবদান রয়েছে। মামারা খেলাধুলা, গান, অভিনয়, কবিতা–সবকিছুতেই পারদর্শী ছিলেন।
মা চাইতেন আমি বড় কিছু হই। হয়তো সেভাবে বড় হতে পারিনি। তবে এই ছোটখাটো জীবনে তাঁর আশীর্বাদই আমার সম্বল। আমার মা এখনও টাঙ্গাইলে থাকেন। আমি যখনই তাঁর কাছে যাই, তিনি যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন। মাকে ছাড়া আমার জীবন কল্পনাই করা যায় না। ৭৮ বছর বয়সেও আমাকে নিয়ে তাঁর চিন্তার শেষ নেই।
মায়ের প্রিয় একটি গান আমি প্রায়ই গাই, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি...’। আমার নাটক টিভিতে দেখানো হলে মা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখেন। এমনকি আমার কোনো সাক্ষাৎকার প্রচার হলেও তিনি তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।
আমার মায়ের নাম রোকেয়া। ত্রিশের দশকে জন্মানো আমার মায়ের এই নামকরণ প্রমাণ করে, তখন বেগম রোকেয়া কতটা জনপ্রিয় ছিলেন।
ছোটবেলার অনেক স্মৃতিই মাকে ঘিরে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় আমার দাঁতে ব্যথা হলে মা আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন। তখন প্রথম মানুষের উত্তোলিত হাত ও স্লোগান দেখেছি। এরপর একবার টাঙ্গাইলের করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাবে মায়ের সঙ্গে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ নাটক দেখতে গিয়ে ‘পথহারা পাখি’ গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরে মাকে অনেকবার এই গানটি গাইতে শুনেছি। মায়ের সেই স্মৃতি, সেই গান আমাকে আজও আচ্ছন্ন করে রাখে।
- বিষয় :
- মামুনুর রশীদ
- মা দিবস
- স্মৃতিচারণ
- শাহেরীন আরাফাত
