মায়ের মধুর হাসি – মা দিবসের বিশেষ আয়োজন
এক আলোকিত জীবন
মায়ের সঙ্গে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৬:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘মা’ কেবল একটি শব্দ নয়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নিবিড় ছায়ায় আমরা বেড়ে উঠি, তার কোনো তুলনা নেই– এক অনন্ত মমতার মহাকাব্য। নাড়ির বাঁধনে বোনা সেই অকৃত্রিম স্নেহের ঋণ কি কখনও শোধ করা যায়? বিশ্ব মা দিবসের বিশেষ আয়োজনে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। গ্রন্থনা শাহেরীন আরাফাত
-----------------------------------------------------
প্রায় দেড় যুগ হতে চলল আমার আম্মা প্রয়াত। আমি ও আমার স্ত্রী ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষ করার পরে ১৯৭৮ সালে যখন দেশে ফিরে আসি, তখন থেকেই আম্মা আমাদের সঙ্গে থাকতেন। বলতে গেলে তিনি ছিলেন আমাদের সংসারের গৃহকর্ত্রী। নিয়মিত অফিস তো ছিলই, তার ওপর নানা আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে আমার স্ত্রীকে প্রায়ই বিদেশে যেতে হতো। কাজেই সংসারের দৈনন্দিন কাজের তদারকি ছাড়াও আমাদের তিন ছেলেমেয়ের লালন-পালনের ভারও ছিল আম্মার ওপর। এ কারণেই তাঁর প্রতি আমার স্ত্রীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসার বাইরেও এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ কাজ করত। তার প্রমাণ পেয়েছিলাম–আম্মার মৃত্যুতে আমার স্ত্রী শোকে কতখানি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন।
আম্মার স্মৃতিচারণ করতে গেলে শৈশবের স্মৃতি বেশি করে মনে পড়ে। আম্মা সম্ভবত প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্তই পড়েছিলেন; কিন্তু তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। শৈশবে আমাদের মফস্বল শহরের বাসায় বাংলা সাহিত্যের যে একটি বড় সংগ্রহ ছিল, সেটি সম্ভব হয়েছিল আমার আম্মার আগ্রহেই। শৈশবে যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করিনি, তখনই ‘বেগম’ পত্রিকার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়; কারণ আমার আম্মার জন্য প্রতি সপ্তাহে ডাকযোগে পত্রিকাটি আসত।
শৈশবের স্মৃতিতে আরও মনে পড়ে আম্মার ফুলের বাগান করার শখ। আব্বার চাকরির সূত্রে আমরা একসময় ছিলাম নোয়াখালীর রায়পুর থানা শহরে। প্রত্যন্ত মফস্বলে বিলাত থেকে আনা বীজ থেকে বাহারি ফুলের বাগান করতেন। স্থানীয় জমিদারের বিলাতফেরত ছোট ভাইয়ের ইংরেজ স্ত্রীর সঙ্গে আম্মার বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল। ফুলের বীজের প্যাকেট তাঁর কাছ থেকেই আম্মা সংগ্রহ করতেন।
এ ছাড়া আম্মার গান শোনার শখ ছিল খুব। বাসায় ছিল সেকেলে ‘কলের গান’ বা গ্রামোফোন; যেটা প্রায়ই সন্ধ্যারাতে আমাদের বাজিয়ে শোনাতেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত সায়গল, জগন্ময় মিত্র, শচীন দেব বর্মণ, কানন দেবীর অনেক গান আমার খুব প্রিয়। এই গানগুলো শৈশবে আমার মায়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তাই আজও গুনগুন করে গাই। আম্মার আরেকটি শখ ছিল এমব্রয়ডারির। পরিবারের সকলের রুমাল থেকে শুরু করে টেবিলক্লথ, বালিশের কভার–সবকিছুতেই ছিল তাঁর এমব্রয়ডারির কাজের ছোঁয়া। তাঁর সেলাইয়ের এসব নৈপুণ্য এক রকমের শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত গিয়েছিল। তাঁর নাতি-নাতনিরা এখন যারা অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় বসবাস করছে, তাদের প্রত্যেকের ঘরের দেয়ালে তাদের দাদুর এমব্রয়ডারির শিল্পকর্ম ফ্রেমবন্দি হয়ে শোভা পাচ্ছে।
ছোটবেলায় আমাদের একটি বর্ধিত পরিবার ছিল। আব্বা ছিলেন আমার অনেক চাচা, ফুফু, চাচাতো-ফুফাতো ভাইবোনের অভিভাবক। এই বর্ধিত পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আম্মা; সবাইকে স্নেহ-যত্ন দিয়ে আগলে রাখতেন। সবার যত আবদার-নালিশ সবকিছুই ছিল আম্মার কাছে। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ নারীকে অভিভাবকতুল্য মনে করা সম্ভবত ঐতিহ্যগতভাবে নোয়াখালীর একটা সামাজিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে।
আম্মা দীর্ঘায়ু ছিলেন। তাঁর বয়স ৯০-এর কাছাকাছি ছিল। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সামান্যই ছিল। কিন্তু পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ, সাহিত্যজ্ঞান ও বৈচিত্র্যময় নানা শখের কাজ–এসব
মিলিয়ে তিনি নিজেই শুধু আলোকিত ছিলেন না, তাঁর সান্নিধ্যে আসা বহু মানুষের জীবনকেও সমৃদ্ধ করেছেন।
