ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘আমি তিলে তিলে মারা যাচ্ছি’

‘আমি তিলে তিলে মারা যাচ্ছি’
×

গাজায় ক্যান্সারের চেয়েও বড় ঘাতক ইসরায়েল। খুলুদ আবু সাহমুদের মতো ক্যান্সার রোগীরা বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন / ছবি:: মিডল ইস্ট আই

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ গাজার একটি স্কুলভবন, যা এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবির। সেই ভবনের সিঁড়ির নিচের স্যাঁতসেঁতে, দমবন্ধ করা ছোট্ট একটি প্রকোষ্ঠে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন ৩৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা খুলুদ আবু সাহমুদ। 

একসময় যার হাতে থাকত বই, চোখে থাকত নতুন গবেষণার স্বপ্ন– তিনি এখন ক্যান্সারের সঙ্গে এক অসম ও নিষ্ঠুর লড়াইয়ে ধীরে ধীরে হেরে যাচ্ছেন। তাঁর এই পরাজয়ের পেছনে ক্যান্সারের চেয়েও বড় ভূমিকা রাখছে ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক অবরোধ ও চিকিৎসা-বঞ্চনা।

নয় মাস আগে কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার পরপরই খুলুদ জানতে পারেন, তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে লিভার ক্যান্সার। এরপর টানা ১৫টি কেমোথেরাপি সেশন পার করেছেন এই ফিলিস্তিনি মা। কিন্তু ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় তাঁর নির্দিষ্ট ক্যান্সারের জন্য উপযুক্ত কোনো ওষুধ অবশিষ্ট নেই।

সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হতাশাগ্রস্ত খুলুদ বলেন, ‘ডাক্তার আমাকে জানিয়েছেন, যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে তা আমার শরীরের জন্য উপযুক্ত নয়। এই কেমোথেরাপি আমার ক্যান্সার নিরাময় তো করেইনি, উল্টো আমার মাথার চুল ঝরে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই আমার নখের কোনো না কোনো অংশ খসে পড়ে।’

খুলুদের শারীরিক অবস্থা এখন শোচনীয়। পেটে তরল জমার কারণে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগেন তিনি। অস্বাভাবিকভাবে ২০ কেজি ওজন কমে গেছে। তরল জমার কারণে ঠিকমতো খেতেও পারেন না। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ৯ মাস বয়সী নিজের কন্যাসন্তানটিকে জন্ম দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেননি এই হতভাগ্য মা।

গাজার এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় ক্যান্সারের ওষুধ, কেমোথেরাপি, চেতনানাশক থেকে শুরু করে সার্জিক্যাল সরঞ্জাম– সবকিছুর প্রবেশেই কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে।

গাজা সেন্টার ফর ক্যান্সারের পরিচালক ডা. মুহাম্মদ আবু নাদা এক ভয়াবহ বাস্তবতার কথা তুলে ধরে জানান, তীব্র সংকটের কারণে চিকিৎসকরা একসময় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন সেগুলোও ফুরিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে চিকিৎসকরা সাধারণ চিকিৎসা প্রটোকল ভেঙে সিঙ্গেল-ড্রাগ থেরাপির ওপর নির্ভর করছেন; যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে অকার্যকর এবং রোগীর জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

খুলুদের চিকিৎসা গাজায় সম্ভব নয়। জর্ডান বা তুরস্কে উন্নত চিকিৎসার জন্য তার মেডিকেল রেফারেলও অনুমোদন পেয়েছে নয় মাস আগে। কিন্তু তিনি অবরুদ্ধ। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গাজার প্রায় ১১ হাজার ক্যান্সার রোগীর মধ্যে অন্তত চার হাজার জন বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি পেয়েও সীমান্ত অতিক্রম করতে পারছেন না। রাফাহ ক্রসিং আংশিক খোলা হলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে দিনে মাত্র ৫০ জন রোগী বের হতে পারেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে শুধু বিদেশে যাওয়ার অনুমতির অপেক্ষায় থেকে গাজায় প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার ৫৭০ জনের বেশি মুমূর্ষু রোগী।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিজের বাড়ি ধ্বংস হওয়ায় খুলুদ অন্তত ৩০ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বর্তমানে বোনের পরিবারের সঙ্গে ১০ জন মিলে সিঁড়ির নিচের ওই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করছেন। একজন ক্যান্সার রোগীর জন্য যে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন, তার ছিটেফোঁটাও সেখানে নেই। 

তার বিছানার পাশে ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচিয়ে সযত্নে রাখা আছে একটি ওষুধের বাক্স এবং একটি ব্যাগ। ওই ব্যাগে রয়েছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন– প্রায় ৫০টি একাডেমিক সার্টিফিকেট। গাজার ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে (মাত্র এক বছর চার মাসে) মাস্টার্স শেষ করা এই মেধাবী ছাত্রী পিএইচডি শুরু করেছিলেন। স্বপ্ন ছিল বড় অধ্যাপক হওয়ার। তিনি বলেন, ‘আমার পুরো জীবনটাই ছিল শিক্ষার জন্য নিবেদিত। আমি কখনোই শেখা থামাতে চাইনি। কিন্তু এই রোগ আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।’

আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি ও মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটিয়ে ইসরায়েল গাজায় যে স্বাস্থ্য-সংকট তৈরি করেছে, খুলুদ আবু সাহমুদ তারই এক জীবন্ত কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী উদাহরণ। ‘আমি এখন একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে উঠি। আমি তিলে তিলে মারা যাচ্ছি’– খুলুদের এই শেষ কথাগুলো কেবল তাঁর নয়, বরং অবরুদ্ধ গাজায় আটকে পড়া হাজারো মুমূর্ষু রোগীর বুকফাটা আর্তনাদ। এই ‘অন্তহীন অপেক্ষা’ কবে শেষ হবে, তা আজ বিশ্ববিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্ন।

আরও পড়ুন

×