ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

নিজেরা করি’র ৪৫ বছর

নিজেরা করি’র ৪৫ বছর
×
×

নিজেরা করি’র ৪৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীর একটি মুহূর্ত

 শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

তাদের নিজের জমি নেই, অথচ জীবন বাঁধা জমিতেই। অন্যের ক্ষেতে ধান রোপণ করেন, ঘেরের নোনাপানিতে নামেন, দিনমজুরি খাটেন। সেই হাতেই এবার উঠেছিল সুঁই-সুতা আর রঙিন কাপড়। খুলনার পাইকগাছা, নাটোরের বাগাতিপাড়া, নোয়াখালীর চরজব্বর আর টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর ভূমিহীন নারী-পুরুষ ও তাদের সন্তানরা নিজেদের জীবন বুনেছেন অ্যাপ্লিকে, ছাপা কাপড়ে আর কাপড়-তুলার পুতুলে। অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘নিজেরা করি’র ৪৫ বছর পূর্তিতে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে ২৯ অক্টোবর শুরু হয় প্রদর্শনী ‘প্রান্তিকের কল্পজগৎ’। গ্যালারিতে ছিল সবজি বিক্রেতা, খেজুরগাছে রস নামানো, কুঁড়েঘর, হাঁস আর শহীদ মিনার। ছাদ থেকে ঝুলছিল জামদানি শাড়ি, তাতে অ্যাপ্লিকে লেখা দাবি: ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার, সম্পদে তার সমঅধিকার’। বৃত্ত আর্টস ট্রাস্টের শিল্পীরা কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন। প্রদর্শনীর উদ্বোধক শিল্পী সৈয়দ আবুল বারক আলভী অবাক হয়েছেন, শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ না নিয়েও তারা এত সুন্দর কাজ করেছেন।
নিজের কাজ নিজে করার এ ভাবনাই সংগঠনের নামে। সংগঠনের সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, ‘গ্রামে কাজ করতে গিয়ে ধনী-গরিবের, জাতিগত আর নারী-পুরুষের বৈষম্যের রূপ দেখেছি। অথচ সংবিধান বলে, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমান। তাই ঠিক করলাম, কারও ওপর নির্ভর না করে মানুষকে সংগঠিত করব, যাতে নিজেদের জীবন আর সমাজ তারা নিজেরাই বদলাতে পারেন।’
ভিত্তি ছিল ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরির দর্শন। সেখানে মানুষ শেখানো বুলি আওড়ান না, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন তোলেন। বেশির ভাগ সংস্থা যখন ঋণ আর সাহায্য বিতরণে ব্যস্ত, নিজেরা করি সে পথে যায়নি। সংগঠনটির মতে, দারিদ্র্যের মূলে সম্পদের অভাব নয়, আছে সম্পদের অসম বণ্টন আর নারী-পুরুষের বৈষম্য।
পথটা সহজ ছিল না। খুশী কবির বলেন, ‘স্বৈরশাসনের সময় মামলা আর গ্রেপ্তারের ভয় মাথার ওপর ঝুলে থাকত। প্রশ্ন ছিল–এত কঠিন কাজ টিকবে কিনা। তবু আমরা থামিনি।’ খাসজমি উদ্ধারে বারবার প্রভাবশালীদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৯০ সালের ৭ নভেম্বর খুলনার হরিণখোলায় চিংড়িঘেরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গুলিতে প্রাণ হারান ভূমিহীন নেত্রী করুণাময়ী সরদার। খুশী কবির বলেন, ‘ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে, সমাজে বিভেদ ছড়িয়ে আমাদের থামানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আমরা নীতি থেকে সরিনি। আমাদের দলে সব ধর্মের, সব মতের মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন।’
লড়াইয়ের আরেক হাতিয়ার সংস্কৃতি। দলের কিশোর-কিশোরী আর তরুণরাই নাটক লেখে, মঞ্চে তোলে। ৩১ অক্টোবর (শনিবার) সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চে সেই চর্চারই দেখা মিলেছে। খুলনার দল দেখিয়েছে, চিংড়িঘেরের নোনাপানি কীভাবে ফসলি জমি খেয়ে ফেলে। কুমিল্লার নাটক ছিল নারী নির্যাতন নিয়ে। টাঙ্গাইলের দল তুলে ধরেছে, ইটভাটার ধোঁয়া কীভাবে বাতাস বিষিয়ে জমি নষ্ট করছে। নাটোর, রংপুর আর গাইবান্ধার কয়েকজন কর্মী মঞ্চে এনেছেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের এক নদীর কথা। সেখানে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি বর্জ্য ফেলে নদী দূষিত করছেন, কারও কথা কানে তোলেন না। নাটকটি তারা আগেও অনেক জায়গায় করেছেন। মঞ্চের কেউ পেশাদার অভিনেতা নন। মাঠে রোজ যে লড়াই লড়েন, সেটাই তারা মঞ্চে তুলে এনেছেন। 

আরও পড়ুন

×