ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জেনে রাখুন

বীমা দাবি প্রত্যাখ্যান কেন ঘটে, কীভাবে এড়ানো যায়

বীমা দাবি প্রত্যাখ্যান কেন  ঘটে, কীভাবে এড়ানো যায়
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাধারণ মানুষ বীমা করেন সঞ্চয়ের পাশাপাশি বিপদের সময় আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে। যা ব্যক্তি, পরিবার বা ব্যবসাকে আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, মৃত্যু বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সময় আর্থিক সুরক্ষা দেয়। এর সঙ্গে বাড়তি সুবিধা হলো, বীমা আয়করমুক্ত। 

বীমা গ্রহীতারা বছরের পর বছর নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ করে যান। পলিসির মেয়াদ শেষে নির্ধারিত কাগজপত্রসহ আবেদনের পর সেই কাঙ্ক্ষিত অর্থ গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করে বীমা কোম্পানি। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়। নানা কারণেই বীমা দাবি বাতিল হয়, যা গ্রাহকের জন্য এক ধরনের মানসিক ও আর্থিক ধাক্কা। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থতা বা আর্থিক সংকটকালীন মুহূর্তে দাবি পরিশোধ না হওয়া পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।

অনেকে মনে করেন, বীমা কোম্পানিগুলো দাবি পরিশোধ করতে চায় না। কিন্তু এর মাঝেও কিছু কোম্পানির দাবি পরিশোধের হার সন্তোষজনক। অনেক ক্ষেত্রে দাবি বাতিল হওয়ার পেছনে গ্রাহকের অসতর্কতা বা নিয়ম না বোঝার বিষয়টি প্রধান ভূমিকা রাখে। আবার কখনও কখনও নিয়মভঙ্গ বা অসদুপায় অবলম্বনের কারণেও দাবি নাকচ হয়। তাই, বীমা দাবি গ্রহণযোগ্য করতে হলে কেন  প্রত্যাখ্যাত হয় এবং কীভাবে তা এড়ানো যায়– এ বিষয়ে গ্রাহকের স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
বীমা দাবি প্রত্যাখ্যানের ঘটনা গ্রাহকের আস্থা নষ্ট করে এবং অনেক সময় পুরো খাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অথচ সামান্য সচেতনতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো সম্ভব। গ্রাহকের দায়িত্ব সঠিক তথ্য ও নথিপত্র প্রদান করা।  আর কোম্পানির দায়িত্ব হলো গ্রাহককে নিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া। উভয় পক্ষ দায়িত্বশীল হলে বীমা খাতকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর করা যাবে।

কেন দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়
বীমা চুক্তি একটি আনুষ্ঠানিক দলিল, যেখানে বিভিন্ন শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।  শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে জটিলতা দেখা দেয়। গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তথ্য মতে বীমা দাবি প্রত্যাখ্যানের অন্যতম কারণ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যয়ের রসিদ প্রদানে ব্যর্থতা। দাবি করার সময় সঠিক কাগজপত্র জমা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, গ্রাহক চিকিৎসা খরচের রসিদ বা হাসপাতালের বিল সংরক্ষণ করেন না, কিংবা  অসম্পূর্ণ থাকে। ফলে কোম্পানি খরচের সত্যতা যাচাই করতে না পেরে দাবি নাকচ করে। পূর্ব থেকে বিদ্যমান অসুস্থতা গোপন করাও একটি কারণ। পলিসি গ্রহণের আগে যেসব শারীরিক সমস্যা ছিল, সেগুলো যদি গ্রাহক লুকিয়ে রাখেন তবে পরবর্তী সময়ে সেই অসুস্থতার কারণে করা দাবি গ্রহণযোগ্য হয় না। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি হার্টের সমস্যা গোপন করে ইন্স্যুরেন্স নেন, পরে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলে কোম্পানি তা ‘প্রি-এক্সিস্টিং কন্ডিশন’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি বাতিল করতে পারে। কিছু গ্রাহক মিথ্যা তথ্য বা জাল কাগজপত্র জমা দেন।  যেমন– হাসপাতালে ভর্তি না হয়েও ভর্তি খরচ দেখানো, অথবা চিকিৎসার ব্যয় অতিরঞ্জিত করা। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তদন্তে এ ধরনের অসংগতি পেলে পুরো দাবিই বাতিল করে দেয়। যে সব দুর্ঘটনা বা ঘটনা বেআইনি কাজের সঙ্গে জড়িত, সেগুলো থেকে করা দাবি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কখনও গ্রহণ করে না। যেমন– ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে, আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু, অথবা খুন-অপরাধে জড়িয়ে পড়লে  দাবিগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হয়। 

পলিসির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি জানাতে হয়। কিন্তু অনেকেই অসচেতনতার কারণে দেরি করে আবেদন করেন। এতে দাবি বাতিল হয়ে যায়। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো সাধারণত স্পষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়, যেমন ৩০ দিন বা ৬০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে। আবার সব দাবি ইন্স্যুরেন্সের আওতায় পড়ে না। পলিসিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে কোন দুর্ঘটনা বা পরিস্থিতি কাভার হবে আর কোনগুলো হবে না। পলিসির বাইরে থাকা ঘটনায় বীমা দাবি করলে তা গ্রহণ করা হয় না। 

কীভাবে এড়ানো যাবে
কিছু পদক্ষেপ মেনে চললে দাবি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রথমত– দাবি জমা দেওয়ার আগে পলিসির শর্তাবলি ও বর্জনীয় বিষয়গুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এতে গ্রাহক বুঝতে পারবেন কোন দাবি গ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়ত– বীমা কোম্পানিগুলো নিয়মিত সচেতনতা সেশন আয়োজন করতে পারে, যেখানে গ্রাহকদের সঠিকভাবে নথিপত্র প্রস্তুতের পদ্ধতি শেখানো হবে। এ ছাড়া শুধু নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্র সংরক্ষণ করা জরুরি। একইভাবে দাবি জমা দেওয়ার সময় তথ্য সঠিক ও সম্পূর্ণভাবে প্রদান করাও অপরিহার্য। 
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পলিসি নেওয়ার সময় গ্রাহকের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব তথ্য স্বচ্ছভাবে জানানো। পূর্ববর্তী অসুস্থতা গোপন করলে ভবিষ্যতে বীমা দাবি বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

আরও পড়ুন

×