রড সিমেন্টের কাঁচামালে যৌক্তিক শুল্ক-কর চান উদ্যোক্তারা
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে চলছে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণ খাতের প্রধান দুই উপকরণ রড ও সিমেন্টের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনে জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের দামও চড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের জন্য ফ্ল্যাট কেনা কিংবা ঘর-বাড়ি নির্মাণ কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যয় বাড়ছে সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রড-সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক-কর কমানো ও দীর্ঘমেয়াদে নীতি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
অন্যদিকে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রড-সিমেন্টের দাম বাড়লে নির্মাণ খাতে বড় প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের অনেকের বাড়ি বানানো কিংবা ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা কমে যায়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আর্থিক খাতে।
স্টিল তথা রড উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল মেল্টিং স্ক্র্যাপ, বিলেট ও ফেরো অ্যালয়। এসব কাঁচামাল আমদানি হয় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। অন্যদিকে সিমেন্ট তৈরিতে পাঁচ ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার হয়। যেমন– ক্লিংকার, জিপসাম, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশ। এগুলোর বেশির ভাগ আমদানিনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিপজ্জনক হয়ে উঠছে সমুদ্রপথ। এতে বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দর বেড়েছে। জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক-কর।
স্টিল খাতের উদ্যোক্তারা জানান, নানা কারণে দেশের স্টিল খাত এখন করুণ অবস্থায় আছে। পাঁচ-ছয় বছর ধরে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ প্রায় বন্ধ। দেশে বছরে রডের চাহিদা ৭০ লাখ টনের মতো, কিন্তু উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টনের। একই পরিস্থিতি সিমেন্ট খাতে। বছরে দেশে চার কোটি টন সিমেন্টের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দেশের উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে আট থেকে ৯ কোটি টনের। কিন্তু চাহিদা কম থাকা ও গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে পুরো উৎপাদনসক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
স্টিল উৎপাদনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি টন পুরোনো লোহার টুকরা আমদানিতে শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হয় দুই হাজার ৪০০ টাকা। উৎপাদন পর্যায়ে পুরোনো লোহা গলিয়ে বিলেট এবং বিলেট থেকে রড তৈরিতে মূসক প্রতি টনে দুই হাজার ৭০০ টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া স্পঞ্জ আয়রন ও পিগ আয়রন আমদানিতেও অতিরিক্ত শুল্ক-কর দিতে হয়।
সম্প্রতি রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার ও সমকাল আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, ডলারের দাম ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০-১২৫ টাকা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো ঋণসীমা বাড়ায়নি, বরং আরও কমিয়েছে। বর্তমানে এ খাত আইসিইউতে আছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও এনবিআরের করের চাপ কমেনি। অর্থাৎ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংস্কার না করলে ভবিষ্যতে কেউ বিনিয়োগ করবে না।
সমকালকে তিনি বলেন, স্টিল খাতের কাঁচামাল আমদানির সময় অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হয়। আবার যখন উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হয় তখনও দুই শতাংশ অগ্রিম আয়কর কেটে রাখা হয়। এই অর্থ পরে সমন্বয় করা হয় না এবং এগুলো দিয়েই ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। বন্দরে আমদানি শুল্ক নির্ধারিত থাকলেও পণ্য খালাসে হয়রানি করা হয়।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বাজেট প্রস্তাব দিয়েছে সিমেন্ট খাতের সংগঠন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)। এতে তারা বলেছেন, বর্তমানে সিমেন্ট ক্লিংকার আমদানিতে অ্যাসেসেবল ভ্যালুর ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়। এটি পরিবর্তন করে প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা দরকার। ক্লিংকার, স্লাগ, ফ্লাই অ্যাশ, লাইমস্টোন এবং জিপসামের ওপর বিদ্যমান দুই থেকে পাঁচ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বা এআইটি দিতে হয়। সিমেন্ট বিক্রির ক্ষেত্রেও দুই শতাংশ এআইটি পরিশোধ করতে হয়। উভয়ক্ষেত্রেই এআইটি পরিশোধের হার কমিয়ে দশমিক পাঁচ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে বিসিএমএ।
সিমেন্টের কাঁচামালের শুল্কায়নের এনবিআর নির্ধারিত মূল্যের পরিবর্তে ইনভয়েস মূল্য গ্রহণ করার জোর দাবি জানিয়েছেন বিসিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি বলেন, বর্তমানে ক্লিংকারের জন্য টনপ্রতি সাড়ে ৫২ ডলার, স্লাগের জন্য ৩০ ডলার ও লাইমস্টোনে সাড়ে ২০ ডলার ন্যূনতম মূল্য ধরে শুল্কায়ন করা হয়, যা বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি, এটি কমানো জরুরি।
বিসিএমএর নির্বাহী সদস্য ও ডায়মন্ড সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেক বলেন, যুদ্ধের কারণে গত কয়েক দিনে আমদানি পর্যায়ে প্রতি টন ক্লিংকারের দাম ১০ থেকে ১২ ডলার বেড়েছে। জিপসাম, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশের দাম ৮-১০ ডলার করে বেড়েছে। তিনি বলেন, যেমন কাঁচামালের দাম বেড়েছে, তেমনি গ্যাস সংকটও বাড়ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার কারণে অনেক মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ফ্ল্যাট ও ঘরবাড়ি নির্মাণ। উদ্বেগ বাড়ছে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, এতে ফ্ল্যাটের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে অনেকের পক্ষে ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে যাবে। এমন প্রেক্ষাপটে নির্মাণ খাতের পণ্যে শুল্ক-কর কমানোর পাশাপাশি ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ব্যয় কমানো দরকার।
- বিষয় :
- রডের দাম বৃদ্ধি
