আসছে বাজেট
উৎসে কর নিয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি পোশাক খাতে
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রায় প্রতি বছর বাজেটে রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে উৎসে করের পরিবর্তনের বিষয়টি। রপ্তানির সময় পোশাকের দর অনুযায়ী এই কর কেটে রাখা হয়। বর্তমানে এই হার ১ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানির পোশাকের দাম ১০০ টাকা হলে উৎসে কর হিসেবে ১ টাকা হারে কেটে রাখা হয়। রপ্তানিকারক উদ্যোক্তারা এই হারকে যথেষ্ট বেশি মনে করেন। নিয়ম হচ্ছে, অগ্রিম এই আয়কর বছর শেষে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য করের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ এই ১ শতাংশ অন্যান্য কর থেকে বাদ দেওয়া হবে। রপ্তানিকারকার বলছেন বাস্তবতা হচ্ছে, এই কর সমন্বয় করা হয় না। বছরের পর বছর ধরে উৎস কর নিয়ে এমন পরিস্থিতি চলছে।
এবারও বাজেটকে ঘিরে উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকদের প্রধান উদ্বেগের এই নাম উৎসে কর। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে এ সম্পর্কিত দাবিটি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে উৎসে কর বর্তমানের ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একই হারের উৎসে করকে ‘চূড়ান্ত করদায়’ হিসেবে বাস্তবায়ন করার দাবি তাদের। শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশের হার যেন অন্তত আগামী ৫ বছর পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়–সেই দাবিটিও করেছেন তারা।
গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত অর্থবিলের মাধ্যমে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য উৎসে কর কর্তনের হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাক রপ্তানি যে সংকটময় অবস্থায় রয়েছে, তা বিবেচেনায় এই হারকে অত্যন্ত বেশি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। পরিস্থিতি মাথায় রেখে উৎসে করের এই হার পুনর্বিবেচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তারা।
এর আগে বেশ কয়েক অর্থবছর বিভিন্ন বৈরী পরিস্থিতি বিবেচনায় এক বছর মেয়াদের জন্য কখনও শূন্য দশমিক ২৫, কখনও শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হিসেবে উৎসে কর কর্তনের সুবিধা প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। পরে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে তা কার্যকর করা হতো। আয়কর অধ্যাদেশ অনুসারে, যে ব্যাংকের মাধ্যমে একজন রপ্তানিকারকের পণ্যের রপ্তানি আয় গৃহীত হয়, তা ক্রেডিট করার সময় মোট রপ্তানি আয়ের ১ শতাংশ হারে কর কর্তন করা হয়।
তৈরি পোশাক খাতের নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, নিয়ম আছে উৎসে কর অন্যান্য করের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। তবে আজ পর্যন্ত এরকম একটি নজিরও নেই যে, উৎসে কর অন্য কোনো করের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।
নিজের কারখানা এমবি নিটের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, উৎসে করের সমন্বয়ের পরিবর্তে রাজস্ব কর্মকর্তারা অন্যান্য লেনদেনের ক্ষেত্রে উল্টো নানান হয়রানি করে থাকেন। দীর্ঘ দিন ধরে এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও কোনো কূলকিনারা হয়নি।
তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ দ্বিমুখী সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক কারখানা ইতোমধ্যে এই বিপুল ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দেশের কর্মসংস্থান ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তৈরি পোশাক খাতের জন্য উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য ৬৫ শতাংশ করা, এটিকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করা এবং ব্যবসায়ী মহলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুবিধার্থে এই নীতি আগামী ৫ বছর পর্যন্ত অপরিবর্তিত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা। এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাক উৎপাদক এবং রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান সমকালকে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উৎসে কর কমানোর দাবি বিবেচনায় নেওয়া খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। তা না হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। কর্মসংস্থান কমবে। শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে হয়তো। কাজ, রপ্তানির আদেশ না থাকলে শ্রমিকদের বেতনের জোগান আসবে কোত্থেকে। অথচ টেকসই শিল্প এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য এখন শ্রমিকদের দক্ষ এবং অভিজ্ঞ করে তোলা প্রয়োজন। গত কয়েক মাসের ধারাবাহিকতায় আগামীতে রপ্তানিতে নেতিবাচক পরিস্থিতি অব্যাহত থেকে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
পোশাক খাতে নানামুখী সংকট: উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের পোশাকশিল্প খাত একটি অত্যন্ত জটিল ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক বাজারে নানামুখী চ্যালেঞ্জের কারণে পোশাক রপ্তানি কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কম হয়েছে। শুধু মে মাসে কমেছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
কারখানাগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী চলতে পারছে না। এর ফলে উৎপাদন কমলেও কারখানার স্থায়ী খরচ বা নির্ধারিত খরচ আনুপাতিক হারে বেড়েছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়কে বাড়িয়ে দিয়েছে। রপ্তানি আদেশ কমে আসার পাশাপাশি নতুন শ্রেণির বাজারেও মন্থর গতি চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-জানুয়ারি ২০২৫-২৬ সময়ে কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার পরিমাণ ডলারের মূল্যে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ কমেছে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতি এবং ইউরোপের বাজারে চীনের মূল্য হ্রাসে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি মূল্যের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমেছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ চেইন ব্যবস্থার অবনতির কারণে কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। তবে তৈরি পোশাকের ব্র্যান্ড ক্রেতারা সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ায়নি। ফলে লোকসান বা নামমাত্র মুনাফায় কারখানা সচল রাখতে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বর্তমানে ১২ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি ২০১৭-২০২৩ সময়ের মধ্যে গ্যাসের দাম ২৮৬ শতাংশ এবং গত ৫ বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ এক লাফে ৪১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরের বাজেট বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরামর্শক কমিটির সভায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকেও পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের উৎসে কর নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এফবিসিআইর প্রস্তাবনায় বলা হয়, রপ্তানিকারদের জন্য মোট রপ্তানি আয়ের ১ শতাংশ হারে অগ্রিম কর প্রযোজ্য। এটি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়ে এফবিসিসিআই বলেছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ বেড়ে যাওয়া, কভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়া এবং রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা কমে যাওয়ার কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পে লাভজনকতা কমেছে। তাই রপ্তানি আয়ের ওপর উৎসে কর কমানো দরকার।
পোশাক খাতের অন্যান্য প্রস্তাব
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানো এবং ম্যান মেইড ফাইবারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে কৃত্রিম তন্তু আমদানিতে বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখা এবং রিসাইকেলড ফাইবার উৎপাদনে ভ্যাট প্রত্যাহার চান উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকরা। তাদের মতে, বিশ্ববাজারের বিশাল অংশ দখলে নিতে হলে তুলাভিত্তিক পোশাকের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানিতে জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে বিশ্ববাজারের মাত্র ৩০ শতাংশ সুতি বা তুলাভিত্তিক পণ্যের দখলে। বাকি ৭০ শতাংশ দখল করে আছে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান মেইড ফাইবার। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও ৭৩-৭৫ শতাংশ কটননির্ভর হওয়ায় এই বিশাল বাজার ধরা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এক্ষেত্রে নীতিসহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে রিসাইক্লিং শিল্পের বিকাশে বর্তমান ভ্যাট কাঠামো বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ব্যবস্য়ীরা জানান, একটি রিসাইক্লিং মিল যখন গার্মেন্টস কারখানা থেকে ঝুট সংগ্রহ করে, তখন তাকে ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। সেই ঝুট থেকে উৎপাদিত ফাইবার বা সুতা যখন স্পিনিং বা টেক্সটাইল মিলে বিক্রি করা হয়, সেখানেও ভ্যাটের জটিলতা বিদ্যমান। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ফ্যাশনের চাহিদা বিবেচনা করে রিসাইকেলড ফাইবার বা সুতার ওপর আরোপিত এই ভ্যাট সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে পোশাক খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে।
সাব-কন্ট্রাক্ট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিল পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তনের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটি বলেছে, রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ও সক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের সাব-কন্ট্রাক্ট কার্যক্রমে ঢাকা অধিক্ষেত্রে অবস্থিত হলে আগের মতো বিজিএমইএ থেকে জারি করা ইন্টারবন্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে সাব-কন্ট্রাক্ট কার্যক্রম অনুমোদন করা যেতে পারে।
- বিষয় :
- বাজেট
