ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

অভিমত

রপ্তানি খাতে ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি-বিদ্যুৎ প্রয়োজন

রপ্তানি খাতে ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি-বিদ্যুৎ প্রয়োজন
×

আশিকুর রহমান তুহিন

আশিকুর রহমান তুহিন

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে চলা যুদ্ধাবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তার অভিঘাত এখন স্পষ্টভাবে এসে পড়েছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত পোশাকশিল্প আজ বহুমাত্রিক চাপের মুখে রয়েছে। রপ্তানি আদেশ কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দাম সমন্বয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে এমন একটি অস্থির ও কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যে এ শিল্পের সক্ষমতাকে বজায় রেখে একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক উদ্যোগ। প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে অনেক কারখানা আর্থিক সংকটে পড়ে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে, যা শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াবে।

গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংঘাত যেন নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধের চলমান অস্থিরতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে আবার শুরু হয় ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধের এই বহুমাত্রিক প্রভাব শুধু রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রত্যক্ষ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানির বাজার এবং ভোক্তা আচরণে।
যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ভোক্তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এবং ক্রয়প্রবণতা উভয়ই কমে গেছে। ফলে মানুষ প্রয়োজনীয় ব্যয়ের বাইরে অতিরিক্ত কেনাকাটায় আগ্রহ হারাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপরও। তারা এখন আগের তুলনায় কম পরিমাণে পোশাক কিনছে। পোশাক ব্র্যান্ডগুলো নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাত মূলত বৈশ্বিক বাজারনির্ভর। 
তাই স্বাভাবিকভাবেই এই বৈশ্বিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই শিল্পের ওপর। এর প্রতিফলন ইতোমধ্যেই রপ্তানি পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান। অর্থাৎ রপ্তানি ও উৎপাদনের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা আরও কিছু সময় স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্প খাতের সংকট আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। একদিকে ক্রয়াদেশ কমছে, অন্যদিকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। একই সময়ে শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব ভাতা পরিশোধের চাপও রয়েছে। বিশেষ করে গত দুই ঈদের মধ্যবর্তী সময়টিতে অনেক কারখানার জন্য আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কাঁচামাল আমদানি, পরিবহন এবং জাহাজীকরণ ব্যয় বেড়ে গেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এই অতিরিক্ত ব্যয়ের ভার নিজেদের ওপর নিতে রাজি নন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এতে শিল্পের ঝুঁকি আরও গভীর হচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। সরকার যদি সরাসরি নগদ প্রণোদনা দিতে নাও পারে, তাহলেও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ভর্তুকিমূল্যে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং কারখানাগুলো অন্তত স্বল্প মেয়াদে কার্যক্রম সচল রাখতে পারবে।
একই সঙ্গে পোশাক খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ক্রেতা ফোরামগুলোর সঙ্গে সক্রিয় আলোচনায় বসতে হবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামালের ব্যয় ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির বাস্তবতা তুলে ধরে পোশাকের ক্রয়মূল্য পুনর্নির্ধারণের দাবি জানানো অত্যন্ত জরুরি। পোশাকের মূল্যবৃদ্ধি সামান্য হলেও তা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে আগের মতো স্থিতিশীল বাজার ও সহজ বাণিজ্য পরিবেশ হয়তো আর ফিরে আসবে না। এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে শুধু টিকে থাকলেই চলবে না, বরং পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আরও সক্ষম ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে হবে। 

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ

আরও পড়ুন

×