ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা নিতে পারছে না এসএমই

বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা নিতে পারছে না এসএমই
×

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৪ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের শিল্প খাতের ৯২ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ। কিন্তু রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে এ খাতের চিত্র উল্টো। বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার সুবিধা নিতে পারছে না এসএমই খাত।  

বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ১০৭টি এসএমই প্রতিষ্ঠানের ওপর গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে বিল্ড। এতে দেখা গেছে, ১০৭টি প্রতিষ্ঠানের একটিও বর্তমানে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে না।
বিল্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, রপ্তানিকারক ও অ-রপ্তানিকারক এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শ্রম উৎপাদনশীলতায় কোনো দৃশ্যমান পার্থক্য নেই। এই গবেষণার জরিপে ৮৫ শতাংশ উদ্যোক্তা প্রশাসনিক জটিলতা, ৬৫ শতাংশ অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং ৬৪ শতাংশ কাঁচামালের ওপর উচ্চ শুল্ককে রপ্তানির প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। 
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সক্ষমতার অভাব নয়; বরং নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণেই এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্ববাজারে যেতে পারছে না। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের মাত্র ১৩ দশমিক ১ শতাংশ পরোক্ষভাবে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত, যার মধ্যে সরাসরি রপ্তানি করছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বার্ষিক ৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে, তা মোকাবিলায় এসব নীতিগত বাধা দূর করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

রপ্তানিতে প্রধান বাধা যেগুলো
বিল্ডের জরিপে অংশ নেওয়া ৮৫ শতাংশ উদ্যোক্তা রপ্তানির প্রধান অন্তরায় হিসেবে প্রশাসনিক জটিলতাকে চিহ্নিত করেছেন। এ ছাড়া ৬৫ শতাংশ অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং ৬৪ শতাংশ কাঁচামালের ওপর উচ্চ শুল্ককে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করে পদ্ধতিটি ডিজিটাল করা হলেও মূল জটিলতা কমেনি। বরং ২০২৪ সালের নতুন বিধিমালায় শর্তগুলো আরও কঠিন করা হয়েছে, যাকে গবেষকরা ‘আইসোমরফিক মিমিক্রি’ বা পুরোনো আমলাতান্ত্রিক বিধিনিষেধের ডিজিটাল রূপ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসএমই উদ্যোক্তারা কাঁচামাল আমদানিতে বাণিজ্যিক মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। সরাসরি আমদানির সুযোগ না থাকায় তাদের কাঁচামালের ওপর প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, হোম টেক্সটাইল খাতে সুতা আমদানিতে যে পরিমাণ শুল্ক দিতে হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বার্ষিক নিট মুনাফার চেয়েও বেশি। এ ছাড়া কৃষি প্রক্রিয়াজাত রপ্তানি পণ্যের ওপর ভ্যাটের কার্যকর বোঝা প্রায় ১৯৫ শতাংশ, যা এই খাতের বিকাশে বড় অন্তরায়।

জরিপে দেখা গেছে, ৮২ দশমিক ২ শতাংশ উদ্যোক্তা বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং এর বিকল্প সুবিধা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। অথচ যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রপ্তানি শুরু করতে আগ্রহী। আইএফসির তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পোশাকবহির্ভূত খাতে বছরে অতিরিক্ত দেড় বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব। 
ভৈরব জুতা ক্লাস্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে কর্মরত ৪০ শতাংশ নারী কর্মীর মাসিক আয় মাত্র তিন থেকে চার হাজার টাকা। কিন্তু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই আয় ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা সম্ভব, যা নারী ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে কুমারখালীর মতো শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংযোগ না থাকায় উদ্যোক্তারা 

কাঠ পুড়িয়ে ডাইং বা রং করার কাজ 
করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা পণ্যের মান ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এসএমই খাতে ২৫ শতাংশ ঋণ বিতরণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা মাত্র ১৮ শতাংশে আটকে আছে। জামানত এবং নথিপত্রের জটিলতার কারণেই মূলত ছোট উদ্যোক্তারা এই ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন না। জরিপে দেখা গেছে, কুটির শিল্পের তুলনায় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর (২৬-১২০ কর্মী) রপ্তানি সক্ষমতা ১৪ দশমিক এক গুণ বেশি হলেও তাদের দাবি উপস্থাপনের মতো কোনো শক্তিশালী অ্যাসোসিয়েশন নেই।

উত্তরণের উপায়
বিল্ডের প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, আংশিক রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ লাইসেন্স প্রবর্তন (২৫ শতাংশ রপ্তানি সাপেক্ষে), সুতার ওপর শুল্ক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ৩০ দিনের মধ্যে ডিউটি ড্র-ব্যাক প্রদান করা যেতে পারে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে প্রথম পর্যায়ে কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে শেয়ার্ড বন্ডেড ওয়্যারহাউস, মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব এবং নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকবে। পরে চকরিয়া, ভৈরব ও বগুড়াতেও এই মডেল চালু করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মক্ষমতা পরিমাপক সংশোধন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এসএমই ঋণের জন্য বিশেষ ক্রেডিট স্কোরিং ও ঋণ নিশ্চয়তা স্কিম চালু করার সুপারিশও করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা মনে করেন, নীতিগত বৈষম্যসহ বিভিন্ন সমস্যা দূর হলে এসএমই খাত শুধু স্থানীয় বাজারের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন

×