কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ম্যান মেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকের চাহিদা ও ব্যবহার বাড়ছে বিশ্ববাজারে। তুলায় তৈরি সুতা থেকে প্রস্তুতকৃত সাধারণ পোশাকের চেয়ে ম্যান মেইড ফাইবারে উৎপাদিত পোশাকের দাম কয়েক গুণ। তবে ম্যান মেইড ফাইবারের ক্ষেত্রে আছে উচ্চ শুল্কের খড়গ। কোনো কোনো কাঁচামালে তা ৩৫ শতাংশের মতো। এ শুল্ক প্রত্যাহার চেয়ে দীর্ঘ দিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন উদ্যোক্তারা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সে দাবি অনেকটাই পূরণ হয়েছে। এতে ম্যান মেইড ফাইবারের পোশাক উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল সিন্থেটিক ফেব্রিক্সে থাকা ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্য কিছু কাঁচামালেও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।
ম্যান মেইড ফাইবারের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে ম্যান মেইড ফাইবারের পোশাকের অংশ প্রায় ৭০ শতাংশ। বাকি ৩০ শতাংশ আসে তুলার মতো প্রাকৃতিক তন্তু থেকে পাওয়া সুতায়। বিশ্ববাজারে ম্যান মেইডের অংশ দিন দিন বাড়ছেই। বাংলাদেশের বেলায় তা প্রায় বিপরীত। দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকে এখন ম্যান মেইড ফাইবারের পণ্যের অংশ ২৯ শতাংশ। বাকি ৭১ শতাংশই এখনও তুলায় তৈরি সুতায় উৎপাদিত পোশাক। প্রধান প্রতিযোগী চীনের মোট পোশাক রপ্তানিতে ম্যান মেইডের অংশ ৫২ শতাংশ।
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেওয়া সুবিধায় তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকরা খুশি। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের মতে, আগে কোনো অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের জন্য এত বেশি সুবিধা দেওয়া হয়নি।
জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ম্যান মেইড ফাইবারের কিছু কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে এ ধরনের পোশাক রপ্তানি বাড়বে। বাজেটে প্রস্তাবিত পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারের ওপর ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ও পিবিসি রেজিন এবং পিইটি রেজিনের ওপর প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার হলে আরও ভালো হতো।
এ বিষয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট রপ্তানি খাতে স্বস্তি ফেরাতে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, স্মরণকালের ইতিহাসে তৈরি পোশাক খাতের জন্য এত ভালো বাজেট হয়নি। ম্যান মেইড ফাইবারের পোশাকের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার এবং ছাড়ের ফলে রপ্তানি আয় অনেক বাড়বে। এ ধরনের পোশাকের দাম বেশি পাওয়া যায় এবং প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাকের বিপরীতে এসব পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তবে ম্যান মেইড ফাইবারের মধ্যে পিএসএফ ও পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিন আমদানির ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রাখা ঠিক হয়নি। বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষায় এ ধরনের শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে দেশে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান এটি সামান্য পরিমাণ উৎপাদন করে, যা চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুসারে, তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত আরও কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা পাবে। যেমন, রপ্তানির ওপর নগদ সহায়তার ওপর আয়কর ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে কেনা বিদ্যুতের ওপর উৎস করের হার ৪ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হচ্ছে। রিসাইকেলড বা পুনর্ব্যবহৃত এবং রিসাইকেলযোগ্য কাঁচামালের ওপর করের হার ৩ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজেটে উৎসে কর্তিত কর ‘অগ্রিম কর’ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতদিন করযোগ্য আয় কম থাকা সত্ত্বেও উৎসে কর্তিত করকে চূড়ান্ত দায় বা ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যা রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক পুঁজিতে সংকট তৈরি করছে। উৎসে কর অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হলে বছর শেষে সমন্বয়ের পর উৎসে কর বাবদ অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধিত হয়ে থাকলে তা ফেরত দেওয়া হবে। এতে মূলধন সংকট কাটবে রপ্তানি খাতে।
সার্বিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসাবান্ধব হয়েছে বলে মনে করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য করকাঠামোর একটি পথরেখা দেওয়া হয়েছে। করের ক্ষেত্রে এখন দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি হলো। এর ফলে আগে থেকেই জানা যাবে কত টাকা কর দিতে হবে, যার ফলে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া সহজ হবে। করপোরেট করও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য। উৎসে কর্তিত কর সমন্বয় হবে। প্রণোদনার ওপর আয়কর কমানো হচ্ছে।
আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ পোশাক রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ম্যান মেইড ফাইবারের পোশাকের অংশ ৪০ শতাংশে পৌঁছানো হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাঁচামাল সংকটকে প্রধান বাধা হিসেবে দেখেন উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকেরা। এ ধরনের পোশাকের কাঁচামালের ৮০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। চীন থেকে বড় একটা অংশ আসে। স্থানীয়ভাবে মাত্র ২০ শতাংশ কাঁচামাল জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। তবে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানিতে এই অবস্থান চতুর্থ। এ ধরনের পোশাকের বিশ্ববাজারের ৩৩ শতাংশ চীনের দখলে। চীনের নিজস্ব কাঁচামাল রয়েছে। প্রযুক্তি সুবিধায়ও এগিয়ে তারা। এর ফলে সবচেয়ে কম খরচে এবং দ্রুততম সময়ে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদন সরবরাহ করতে পারে দেশটির উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকেরা। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের পেছনে থাকলেও কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে রয়েছে। এ ধরনের পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের হিস্যা ১২ শতাংশ। ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হওয়ায় দ্রুত সময়ে চীন থেকে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ রয়েছে দেশটির উদ্যোক্তাদের। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। জোটের হিস্যা ১০ শতাংশ। বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। রপ্তানিতে হিস্যা ৫ শতাংশ। ভারত- পাকিস্তানসহ অন্য দেশগুলো পৃথকভাবে বাকি ৪০ শতাংশ কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের জোগান দিয়ে আসছে।
বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ছে। তুলা উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণে পানি লাগে। তুলা থেকে সুতা করা, রং করা ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় অনেক বেশি পানির ব্যবহার হয়। এ কারণে পরিবেশবাদী ও সচেতন ভোক্তাদের মধ্যে প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাকের প্রতি অনাগ্রহ আছে। অন্যদিকে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে একবার ব্যবহৃত কাঁচামাল পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ থাকে। সার্কুলার ইকোনোমি নামে এ ধরনের উৎপাদন কাঠামো তুলনামূলক বেশি পরিবেশসম্মত। ফলে ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম তন্তু বা ব্যবহৃত পোশাক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত কাপড় তৈরিতে ঝুঁকছে। এছাড়া দ্রুত ফ্যাশন পরিবর্তন, আরামদায়ক ও টেকসই হওয়ার সুবিধায় কৃত্রিম পোশাকের কদর বাড়ছে বিশ্বভোক্তা বাজারে।
বাংলাদেশ সেলাই ও কাটাবিহীন অত্যাধুনিক সিমলেসসহ প্রায় ৩০ আইটেমে কৃত্রিম আঁশের পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি করছে। এর মধ্যে গাউন, ওভারকোট, টাই, সুট-কোট, জার্সি, ট্রাউজার, পুলওভার, শার্ট ইত্যাদি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় বিভিন্ন ধরনের জার্সি ও পুলওভার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) কটন বা তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানি কিছুটা কমলেও ম্যান মেইড ফাইবার-ভিত্তিক পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। এ সময় রপ্তানি হয় ৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার।
কৃত্রিম তন্তুর মূল ব্যবহার বেশি করে থাকে বস্ত্রকলগুলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃত্রিম আঁশের সঙ্গে প্রাকৃতিক আঁশের মিশ্রণে তৈরি করা হচ্ছে সুতা ও বস্ত্র। বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশেন (বিটিএমএ) সূত্রে জানা গেছে, কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে সুতা ও কাপড় তৈরিতে বিনিয়োগ করেছে সংগঠনের ৪০টি সদস্য কারখানা। পলিয়েস্টার স্টেপল ফাইবার এবং বিসকস স্টেপল ফাইবারের চাহিদা বেশি থাকায় এ খাতেই বিনিয়োগ রয়েছে কারখানাগুলোর। কৃত্রিম আঁশের পোশাক ফ্যাশনদুরস্ত, টেকসই ও উজ্জ্বল। বারবার ধোয়ার পরও রং নষ্ট হয় না। বৈশ্বিক চাহিদার দিকে
নজর রেখে ধীরে ধীরে কৃত্রিম আঁশ পোশাক বাণিজ্যে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। এতে গুরুত্ব কিছুটা কমছে প্রচলিত তুলা, পাট ও অন্যান্য প্রাকৃতিক আঁশের।
- বিষয় :
- পোশাক খাত
