শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে পূবালী ব্যাংক
মোহাম্মদ আলী
মোহাম্মদ আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী পূবালী ব্যাংক
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, দেশীয় বাজারের তারল্যচাপ এবং ব্যাংকিং খাতের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে পূবালী ব্যাংক। শক্তিশালী আর্থিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ, সুদৃঢ় সম্পদমান এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতি ব্যাংকটিকে দেশের ব্যাংক খাতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পূবালী ব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আলী ব্যাংকের ২০২৫ সালের কার্যক্রম, আর্থিক ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ কৌশল তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত তিন বছরে পূবালী ব্যাংক শুধু ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিই অর্জন করেনি, বরং শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও উল্লেখযোগ্য মূল্য সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সালে যেখানে ব্যাংকের শেয়ারদর ১৬ থেকে ২০ টাকার মধ্যে অবস্থান করছিল, বর্তমানে তা ৩৭ টাকারও ঊর্ধ্বে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিক স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বাজারমূল্য তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে, যা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহকের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন।
তিনি এ সাফল্যের জন্য ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার, গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়িক অংশীদার, গণমাধ্যম ও পরিচালনা পর্ষদের দূরদর্শী দিকনির্দেশনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পূবালী ব্যাংক সুশাসন, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মূল্য সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
মোহাম্মদ আলী বলেন, পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূবালী ব্যাংক শুধু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পিআই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ২০২৫ সালের শেষে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৭৬ জন সক্রিয় ব্যবহারকারী অর্জন করেছে। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে মোট ১.৮৬ কোটি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। বছরওয়ারি হিসাবে ব্যবহারকারী বেড়েছে ৭৮ শতাংশ এবং লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৫ শতাংশ, যা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।
ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালে মার্চেন্ট পিওএস টার্মিনালের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৫২৫টিতে এবং ১.৪৫ লাখের বেশি বাংলা কিউআর স্থাপনের মাধ্যমে নগদহীন লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার বেড়েছে।
পূবালী ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্কও এই রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের ৫১৭টি শাখা, ২৭৪টি উপ-শাখা, ২২টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো এবং ৯০১টি এটিএম, সিআরএম কার্যকর ছিল।
আর্থিক সূচকেও ব্যাংকটি শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট সম্পদ ২০.২৫ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকায় এবং ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। একই সময়ে একীভূত পরিচালন মুনাফা ২ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। শেয়ারহোল্ডার ভ্যালুর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৮.৩০, রিটার্ন অন ইক্যুইটি (আরওআই) ১৫.৫১ শতাংশ এবং রিটার্ন অন অ্যাসেটস (আরওআই) ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস (সিআরএআর) ১৫.৩৪ শতাংশে অবস্থান করেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ন্যূনতম সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং ব্যাংকের মূলধনি শক্তি ও স্থিতিশীলতার পরিচায়ক।
অ্যাসেট কোয়ালিটির ক্ষেত্রেও পূবালী ব্যাংক শিল্পখাতের তুলনায় ব্যতিক্রমী অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের এনপিএল অনুপাত ছিল মাত্র ২.২০ শতাংশ, যেখানে খাতভিত্তিক গড় এনপিএল প্রায় ৩০.৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ডেটানির্ভর মনিটরিং, বিচক্ষণ ঋণব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও পূবালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত রপ্তানি ব্যবসা ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা, আমদানি ব্যবসা ৪৭ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
