অভিমত
মুনাফা অর্জন কৃষিঋণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়
মো. তৌফিকুল ইসলাম
মো. তৌফিকুল ইসলাম
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা। ধান, সবজি, মাছ, শস্য, গবাদিপশু ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদনের মাধ্যমে তারা শুধু নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেন না, বরং দেশের বাজারে খাদ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখেন। সীমিত জমি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বাজারমূল্যের অনিশ্চয়তার মধ্যেও কৃষক দেশের খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এ বাস্তবতায় কৃষিঋণ ব্যবস্থাপনাকে সাধারণ বাণিজ্যিক ঋণের মতো বিবেচনা করা যায় না। কারণ, একজন কৃষকের আয় নির্ভর করে শুধু তাঁর শ্রম ও দক্ষতার ওপর নয়; বরং আবহাওয়া, উৎপাদন পরিস্থিতি, কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর। ফলে কৃষিঋণের ঝুঁকিও অন্যান্য খাতের ঋণের তুলনায় আলাদা প্রকৃতির।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা একটি প্রজ্ঞাপন (বিআরপিডি সার্কুলার নং ১৫/২০২৪) দেশের ঋণ শ্রেণীকরণ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা। একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য এটি নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি হলো–এই নতুন কাঠামো কি কৃষকের বাস্তব ঝুঁকি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে যথেষ্ট বিবেচনায় নিয়েছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষি ও পল্লিঋণের স্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে কৃষি ও পল্লিঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৫8 হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে কৃষিঋণের বকেয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট কৃষিঋণের প্রায় ১৭ শতাংশের বেশি। এ পরিসংখ্যান একদিকে কৃষিঋণের ঝুঁকির বাস্তবতা তুলে ধরে, অন্যদিকে এটিও দেখায় যে, কৃষিঋণের সমস্যা শুধু ব্যাংক ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে উৎপাদন ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষিপণ্যের বাজার অস্থিরতার সম্পর্ক রয়েছে।
বিআরপিডির ওই সার্কুলার কার্যকর হওয়ার আগে স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণের জন্য একটি পৃথক শ্রেণীকরণ কাঠামো ছিল, যা কৃষি খাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে তৈরি করা হয়। নির্ধারিত পরিশোধের তারিখ অতিক্রম করলে ঋণ প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে বিবেচিত হতো। এরপর ঋণ অনিয়মিত থাকার সময় অনুযায়ী ধাপে ধাপে শ্রেণীকরণ হতো। নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ অনিয়মিত হওয়ার ৬ মাস পর ওভারডিউ, ১২ মাস পর সাবস্ট্যান্ডার্ড, ৩৬ মাস পর ডাউটফুল এবং ৬০ মাস পর ব্যাড/লস হিসেবে বিবেচিত হতো।
আগের ব্যবস্থায় একটি স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ ব্যাড/লস পর্যায়ে যেতে প্রায় পাঁচ বছর সময় পেত। এই সময় কৃষককে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলের ক্ষতি বা বাজারমূল্যের পতনের মতো সাময়িক সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দিত। একজন ধানচাষি যদি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হন অথবা সবজিচাষি যদি বাজারে ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে তাঁর ঋণ নিয়মিত করার জন্য ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ থাকত।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, তিন মাসের কম সময় বকেয়া থাকলে ঋণ স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট (এসএমএ) পর্যায়ে চলে যায়, যা মূলত সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি প্রাথমিক সতর্কসংকেত। যদি বকেয়া পরিশোধের সময় তিন মাস বা তার বেশি কিন্তু ছয় মাসের কম হয়, তাহলে ঋণ সাবস্ট্যান্ডার্ড হিসেবে শ্রেণীকৃত হয়। ছয় মাস বা তার বেশি কিন্তু ১২ মাসের কম সময় বকেয়া থাকলে তা ডাউটফুল পর্যায়ে যায়। আর কোনো ঋণ ১২ মাস বা তার বেশি সময় ধরে ওভারডিউ থাকলে সেটি ব্যাড/লস হিসেবে বিবেচিত হয়।
নতুন ব্যবস্থায় একটি স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ নির্ধারিত পরিশোধের তারিখের পর খুব দ্রুত ঝুঁকি পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো ঋণের দুর্বলতা আগেই শনাক্ত করতে পারে এবং সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রভিশন পরিকল্পনা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। তবে কৃষি খাতের বাস্তবতায় এর চ্যালেঞ্জ হলো একজন কৃষকের আয় সাধারণত মৌসুমি হওয়ায় বন্যা, খরা, ফসলের ক্ষতি বা বাজারমূল্যের পতনের মতো কারণে সাময়িক বিলম্বও দ্রুত ঋণের শ্রেণি পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। ফলে ব্যাংকের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষকের বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার জন্য বিশেষ কৃষিভিত্তিক নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কৃষি বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কৃষকের আয় ও ঋণ পরিশোধের সময়সূচির মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা কীভাবে বিবেচনা করা হবে? একজন কৃষক সাধারণত মাসিক আয়ের ওপর নির্ভর করেন না। তিনি উৎপাদনের আগে ঋণ নেন, কিন্তু আয় করেন ফসল বিক্রির পর। এই সময়ের মধ্যে যদি বন্যা, খরা, রোগবালাই, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি বা বাজারমূল্যের পতন ঘটে, তাহলে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঋণ দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে চলে গেলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ওপর চাপ বাড়তে পারে। কারণ বড় কৃষকের বিকল্প অর্থের উৎস থাকলেও ক্ষুদ্র কৃষকের প্রধান ভরসা ব্যাংক বা সরকারি কৃষিঋণ। ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে গেলে অনেক কৃষক উচ্চ সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণের দিকে যেতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এই পরিবর্তনের প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে কৃষি ব্যাংক এবং রাকাব -এর মতো বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ওপর। এসব ব্যাংকের উদ্দেশ্য সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো শুধু মুনাফা অর্জন নয়; বরং কৃষকের কাছে অর্থায়ন পৌঁছে দেওয়া, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে লাখো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ওপর। চাল, সবজি, শস্য, মাছ, গবাদিপশু ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদনে তাদের অবদান দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কৃষিঋণ ব্যবস্থায় এমন কোনো পরিবর্তন আনা উচিত নয়, যার ফলে প্রকৃত কৃষক আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যান।
বর্তমান সমস্যার সমাধান বিআরপিডি সার্কুলারের বিরোধিতা নয়; বরং কৃষি খাতের জন্য বাস্তবসম্মত সহায়ক কাঠামো তৈরি করা।
লেখক: ব্যাংকার ও গবেষক
- বিষয় :
- অভিমত