ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

এলডিসির বাণিজ্য ব্যয় উচ্চ আয়ের দেশের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি

এলডিসির বাণিজ্য ব্যয় উচ্চ আয়ের  দেশের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি
×
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু পণ্য তৈরি করলেই বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় নামা যায় না। কারখানা থেকে বন্দর, বন্দর থেকে জাহাজ, সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা, মান যাচাই, সনদ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধি এবং নানা ধরনের নিয়ন্ত্রক শর্ত। এসব খরচের ভার স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপরই তুলনামূলক বেশি।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য ব্যয় সূচক বলছে, উৎপাদন ও সেবা খাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বাণিজ্য ব্যয় উচ্চ আয়ের অর্থনীতির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। বৈশ্বিক বাণিজ্যে এসব দেশের অংশ এক শতাংশেরও কম। অর্থাৎ বিশ্ব বাণিজ্য বাড়লেও স্বল্পোন্নত দেশগুলো এখনও সেই বাণিজ্যের মূল স্রোতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঢুকতে পারেনি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সর্বশেষ ‘বিশ্ব বাণিজ্য প্রতিবেদন ২০২৬’-এ উঠে এসেছে এই চিত্র।

এই তথ্য বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে বাংলাদেশ। এলডিসি থেকে বের হলে বিভিন্ন বাজারে পাওয়া বাণিজ্য সুবিধা পরিবর্তিত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশও বদলাবে। ফলে রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন খরচের পাশাপাশি বন্দর, পরিবহন, কাস্টমস ও অন্যান্য বাণিজ্য ব্যয় কমানো এখন বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনটির  শিরোনাম ‘বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ’। গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা আট দশকে বিশ্ব বাণিজ্যকে প্রায় ৫০ গুণ বাড়াতে সহায়তা করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক শক্তির পরিবর্তন, সরকারের বাজারে বাড়তি হস্তক্ষেপ, বাণিজ্যের ধরনে পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সেই ব্যবস্থা এখন গুরুতর চাপে রয়েছে।

বাণিজ্য ব্যয় বলতে শুধু পণ্য পরিবহনের খরচ বোঝায় না। উৎপাদনের পর পণ্যটি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত যেসব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ হয়, তার সবই এর আওতায় পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন, বন্দর ও গুদামব্যবস্থাপনা, সীমান্তে পণ্য ছাড়ানোর প্রক্রিয়া, কাগজপত্র, পরীক্ষাগার, মান সনদ এবং বিভিন্ন ধরনের সরকারি বিধিবিধান।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বর্তমানে অধিকাংশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে শুল্কের তুলনায় অশুল্কব্যবস্থা বাণিজ্য ব্যয়ের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। 

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এতদিন তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় এবং বিভিন্ন বাজারে বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রতিযোগিতার অন্যতম ভিত্তি ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে।
ক্রেতারা এখন শুধু কম দামে পণ্য চান না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ, মান, শ্রমপরিবেশ, পরিবেশগত মান, জ্বালানি ব্যবহার এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন দেশের নতুন অশুল্ক শর্ত।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অশুল্ক ব্যবস্থার বিস্তার ছোট রপ্তানিকারকদের জন্য পরিপালন ও সনদ ব্যয় বাড়াচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে ছোট রপ্তানিকারকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের ওপর এই চাপ তুলনামূলক বেশি। একই সঙ্গে এসব দেশের জন্য দেওয়া অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার কার্যকারিতাও জটিল যোগ্যতার শর্ত এবং সুবিধা নবায়নের অনিশ্চয়তায় সীমিত হতে পারে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য এলডিসি উত্তরণ মানে শুধু শুল্ক সুবিধা হারানোর আশঙ্কা নয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বাণিজ্য ব্যয় কমানো এবং নতুন বাজারের শর্ত পূরণের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনও তৈরি হচ্ছে।
এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে প্রথম কাজ বাণিজ্য ব্যয় কমানো। বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানো এবং প্রয়োজনীয় সনদ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা দ্রুত করা জরুরি। এর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার মতো খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন

×