সাক্ষাৎকার
সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রির পরিধি বাড়ায় ভোক্তা কম দামে আরও পণ্য পাবেন
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ, চেয়ারম্যান, টিসিবি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সমকাল: নিত্যপণ্যের উচ্চ দামে স্বল্প আয়ের যেসব মানুষ বাজারে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, টিসিবি তাদের জন্য এক ধরনের ত্রাণকর্তা হয়ে সাশ্রয়ী দামে পণ্য সরবরাহ করে। তাদের জন্য টিসিবির কার্যক্রমের আওতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে কি?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: টিসিবি ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রির পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তার সুবিধার্থে কয়েকটি পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি পণ্যের অনুমোদন আছে, যেগুলো খুব শিগগিরই ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করা হবে।
সমকাল: সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, টিসিবিকে ডিজিটাল সিস্টেমের আওতার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় হবে। এই সাশ্রয় কীভাবে সম্ভব?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: টিসিবির আর্থিক কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশনের জন্য এপিআই পদ্ধতির কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বিক্রয় পদ্ধতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ওই পরিমাণ ভর্তুকি কমানো সম্ভব। বর্তমানের টিসিবির ক্রয় ব্যবস্থাপনা ই-জিপি পদ্ধতিতে হচ্ছে, বিক্রয় ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল কার্ড পদ্ধতিসহ পিওএস মেশিন ও ‘উপকারী’ অ্যাপ চালু হয়েছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে টিসিবির সব কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনে রূপান্তর হবে।
সমকাল: আপনারা এআইনির্ভর রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং পস (পিওএস) মেশিন চালুর কথা বলেছেন। এই প্রযুক্তিগুলো যুক্ত হওয়ায় পণ্য বিতরণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব করে তুলতে আপনাদের প্রস্তুতি কী?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: টিসিবির কার্যক্রমে ইতোমধ্যে এআইর ব্যবহার চালু আছে। এ ছাড়া পস মেশিন ব্যবহারের কার্যক্রম ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সারাদেশে দুই হাজার পস মেশিন সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যে প্রথম চালানে প্রায় ৫০০টি পস মেশিন আগামী মাসের শুরুতে সরবরাহ করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক এআই প্রযুক্তিতে বাজার ব্যবস্থাপনার মনিটরিংয়ের যে কার্যক্রম নেওয়া করা হয়েছে, টিসিবি তার অন্যতম অংশীজন।
সমকাল: এআই সিস্টেম মাঠ পর্যায়ে ডিলারের কারসাজি রোধে কতটা ভূমিকা রাখবে?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: টিসিবির কার্যক্রম একসময় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হতো। ডিজিটাল কার্ড প্রবর্তনের পরে সেই সুযোগ নেই। কারণ, কার্ড সংখ্যার বিপরীতে ডিলারকে যে পণ্য দেওয়া হয়, তা সফটওয়্যারে হিসাব থাকে। কী পরিমাণ পণ্য বিক্রি হলো আর কী পরিমাণ পণ্য অবিক্রীত থাকল তা ডিলার, জেলা প্রশাসন, টিসিবিসহ সংশ্লিষ্ট সবাই দেখতে পায়। অবিক্রীত পণ্য পরের মাসের সঙ্গে সমন্বয় করে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ফলে বর্তমানে ডিলারের কারসাজির কোনো সুযোগ নেই।
সমকাল: আপনারা বলছেন, ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপ চালু হওয়ায় কার্ড হারিয়ে গেলেও গ্রাহকরা পণ্য পাবেন। ডিজিটাল এই সেবায় প্রান্তিক পর্যায়ে উপকারভোগীদের ভোগান্তি হ্রাস পাবে?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: কার্ড হারিয়ে যাওয়ার পর নতুন কার্ড পাওয়া পর্যন্ত একজন ভোক্তার পণ্য না পাওয়ার যে ভোগান্তি, তা আর থাকবে না। কার্ড হারিয়ে গেলেও উপকারী অ্যাপের মাধ্যমে পণ্য উত্তোলন করা যাবে।
সমকাল: অনলাইনে ডিলার নিয়োগ ও ডিজিটাল লটারির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অতীতে দলীয় বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ে ডিলারশিপ দেওয়ার যে অভিযোগ ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে এই প্রক্রিয়া কতটা ভূমিকা রাখবে থাকবে?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: টিসিবি ডিলার নিয়োগে সব সময় প্রকৃত মুদি ব্যবসায়ীকে ডিলারশিপ দিয়ে থাকে। জেলা প্রশাসন মুদি ব্যবসায়ীর সুপারিশ করলেই তাকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এলাকাভিত্তিক প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনায় একাধিক আবেদনকারীদের মধ্যে ডিজিটাল লটারির ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। এখানে দলীয় বা প্রভাবশালী পরিচয়ের সুযোগ নেই।
সমকাল: সুবিধাভোগী কার্ডধারীদের কাছে সঠিক দামে এবং সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কিনা, সেটি কীভাবে নিশ্চিত করবেন?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে সঠিক দামে পণ্য বিক্রি না করা বা ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে টিম পাঠানোর মতো টিসিবির সেই জনবল সক্ষমতা নেই। তবে, এ রকম অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয় এবং সঠিকতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ওই ডিলারের বিরুদ্ধে নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে এ রকম ক্ষেত্রে অনেকের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে।
সমকাল: আপনি আগামী পাঁচ বছরে টিসিবিকে ভর্তুকিমুক্ত এবং আরও কার্যকর ও স্বাবলম্বী করে তোলার চিন্তা করছেন। এতে প্রান্তিক দরিদ্ররা টিসিবির পণ্য কি আরও সহজে ও কম দামে পাবে?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোক্তারা যেসব পণ্য ভর্তুকি মূল্যে পাচ্ছেন, সেগুলো ভর্তুকি মূল্যে পেতে থাকবেন। তবে ভোক্তার সুবিধার্থে কিছু পণ্য বাজারমূল্যের কমে সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এর পরিধি বাড়তে পারে। টিসিবির সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য বিক্রির পরিধি বাড়ায় ভোক্তা কম দামে আরও অনেক পণ্য পাবেন। ভর্তুকি শূন্য হলেও ভোক্তার সুবিধা কমবে না। অতিরিক্ত পণ্যগুলো কারও জন্য বাধ্যতামূলক না করে যেহেতু সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, সেহেতু কার্ডধারী ভোক্তা ছাড়াও সাধারণ জনগণ উপকৃত হবে।
সমকাল: টিসিবির বর্তমান এই আধুনিকায়ন ও সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে দেশের সামগ্রিক সামাজিক সুরক্ষা বলয়কে কতটা দৃঢ় করবে বলে আপনি মনে করেন?
মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ: খাদ্য নিরাপত্তা বা খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হলে সাধারণ মানুষের খাদ্য ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি স্বস্তিদায়ক থাকে। টিসিবির সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য নিয়মিত ভোক্তার নিকট পৌঁছানো হলে ভোক্তার স্বস্তি থাকবে। বিষয়টি অবশ্যই সামাজিক সুরক্ষা বলয়কে আরও সুদৃঢ় করবে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জসিম উদ্দিন বাদল
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার