কৃষিতে রপ্তানি বাড়াতে আইএফআইসি ব্যাংকের নতুন অর্থায়ন মডেল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪০ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে বছরে দেড় কোটি টনেরও বেশি সবজি উৎপাদিত হয়। এ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এক কোটি ৬০ লাখের বেশি কৃষক। অথচ বিপুল এই উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশেরও কম আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। এই ব্যবধান কমাতে কৃষি খাতের অর্থায়ন ব্যবস্থায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে আইএফআইসি ব্যাংক। প্রচলিত ঋণব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের গুণগত মান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপালন এবং রপ্তানির প্রস্তুতিকে অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি মডেল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি খাতের এই ব্যাংকটি। লক্ষ্য বাংলাদেশের কৃষক, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং রপ্তানিকারকদের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।
এ উদ্যোগে আইএফআইসির অংশীদার সুইসকন্ট্যাক্ট। বাংলাদেশের সবজি খাতের স্যানিটারি অ্যান্ড ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মানদণ্ড পরিপালন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিচালিত সেইফ-বিডি প্রকল্পের আওতায় মডেলটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কৃষি খাতে অর্থায়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো, কৃষকের উৎপাদন ও ব্যবসার সম্ভাবনা থাকলেও প্রচলিত ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করা অনেকের জন্য কঠিন। মৌসুমনির্ভর উৎপাদন, খণ্ডিত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও ক্রেতানির্ভর বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে কৃষক ও ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তারা প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের বাইরে থেকে যান। আইএফআইসির প্রস্তাবিত মডেলে এই বাস্তবতাকে ঋণ মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, প্রচলিত জামানত ও আর্থিক তথ্যের পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন পরিস্থিতি, সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ, পণ্যের মান নিশ্চিত করার সক্ষমতা এবং রপ্তানির প্রস্তুতি মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। এ ব্যবস্থায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের উৎস ও সরবরাহের ধারাবাহিকতা শনাক্তকরণ (ট্রেসেবিলিটি), আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং অর্থায়নকে একটি সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খলের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক শুধু ঋণদাতা হিসেবে নয়, কৃষক থেকে রপ্তানিকারক পর্যন্ত পুরো বাণিজ্যিক ব্যবস্থার একটি অর্থায়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণে ঘাটতি বড় বাধা হয়ে রয়েছে। সুইসকন্ট্যাক্টের প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত সবজির বড় অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার প্রবাসী জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক পাইকারি বাজারে যায়। উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বিস্তৃত প্রবেশাধিকার পেতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার মানোন্নয়ন জরুরি। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে যশোর ও নরসিংদীর কৃষি ক্লাস্টারগুলোতে কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষকদের উন্নত কৃষিচর্চা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক এসপিএস মানদণ্ড, খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি হ্যাসাপ, সনদায়ন, রপ্তানি নথিপত্র এবং ট্রেসেবিলিটি বিষয়ে সহায়তা পাবেন।
প্রশিক্ষিত কৃষক ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আইএফআইসি ব্যাংকের কৃষি ও সিএমএসএমই ব্যাংকিং ইউনিটের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি আর্থিক সাক্ষরতা, ঋণ গ্রহণের প্রস্তুতি, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে। এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অর্থায়নকে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা। শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, কোন পণ্য কী মানে উৎপাদিত হচ্ছে, রপ্তানির জন্য কতটা প্রস্তুত এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা কতটুকু, সেটিও গুরুত্ব পাবে।
আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. মেহমুদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই উদ্যোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু কৃষিঋণের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং এমন একটি অর্থায়নসমর্থিত রপ্তানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা উন্নত মানদণ্ড, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত আর্থিক পণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষক ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের বৈশ্বিক ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করবে।’
তিনি বলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের একটি কার্যকর পাইপলাইন তৈরি হবে। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষায়িত অর্থায়ন পণ্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক ক্রেতাদের বাণিজ্যিক সংযোগ তৈরিতে সহায়তা করবে। প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ৫০০ কৃষক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাকে আর্থিক সাক্ষরতা ও ডিজিটাল ব্যাংকিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
- বিষয় :
- কৃষি