ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সাক্ষাৎকার : আবু হেনা মোস্তফা কামাল

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ঠিকমতো ভ্যালু চেইন গড়ে ওঠেনি

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ঠিকমতো ভ্যালু চেইন গড়ে ওঠেনি
×
×

আবু হেনা মোস্তফা কামাল

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি নিয়ে কাজ করছেন। কৃষিবিদ হওয়ায় কৃষির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদন, ব্যবসা ও রপ্তানি নিয়ে কাজ করছেন। কৃষিপণ্য রপ্তানি নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদুর রহমান

সমকাল: বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?

আবু হেনা মোস্তফা কামাল: আমি প্রায় ২৬ বছর ধরে কৃষি নিয়ে কাজ করছি। দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। আমি নিজেও একজন কৃষি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। আমার বিশ্বাস, কৃষক ও কৃষিকে এগিয়ে নিতে পারলে দেশের অর্থনীতিও এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের প্রায় দেড় কোটি কৃষক বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফলসহ কৃষিপণ্য উৎপাদন করছেন। দেশের চাহিদা মেটানোর পর যেসব পণ্য উদ্বৃত্ত থাকে, সেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির বড় সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ আমরা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কৃষি উইংয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার মূল লক্ষ্য হচ্ছে–কোন কোন কৃষিপণ্য বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা সম্ভব, কোথায় নতুন বাজার তৈরি করা যায় এবং প্রয়োজনে কোন পণ্য আমদানির সুযোগ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করা।

সমকাল: কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রধান বাধাগুলো  কী? 

আবু হেনা মোস্তফা কামাল: সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের ভ্যালু চেইন এখনও ঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। পণ্যের ভ্যালু চেইন বা মূল্য শৃঙ্খল হলো–এমন একটি ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে নকশা তৈরি, উৎপাদন, বিপণন এবং গ্রাহকের হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পণ্যের মান ও গুরুত্ব বাড়ানো হয়। কৃষক উৎপাদন করেন। উৎপাদনের পর পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনের পুরো ব্যবস্থাটি সমন্বিত নয়। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য গ্রাম পর্যায়ে অনেক সময় ন্যায্য দাম পায় না। অথচ একই পণ্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী বা সিলেটের মতো শহরে বেশি দামে বিক্রি হয়। ফলে কৃষক তাঁর উৎপাদনের প্রকৃত দাম থেকে বঞ্চিত হন। এ জন্য উৎপাদন বেশি হয় এমন এলাকাগুলোতে ছোট ও মাঝারি আকারের কোল্ডস্টোরেজ বা স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। অনেক সময় কৃষকের পণ্য এক-দুই দিন সংরক্ষণ করতে পারলে বাজারে ভালো দামে বিক্রি করা সম্ভব। এরপর সঠিক ভ্যালু চেইনের মাধ্যমে পণ্যটি জেলা, বিভাগীয় শহর কিংবা রাজধানীর বাজারে নেওয়া যেতে পারে।

সমকাল: রপ্তানির ক্ষেত্রে ভ্যালু চেইনের সমস্যা কীভাবে প্রভাব ফেলে?

আবু হেনা মোস্তফা কামাল: বিদেশে রপ্তানির জন্য শুধু ভালো পণ্য উৎপাদন করলে হবে না। সেটিকে নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী সংগ্রহ, বাছাই, প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিং করতে হবে। পরিবহনের সময়ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে আমের কথা বলা যায়। বাংলাদেশে আমের বড় বাজার রয়েছে। কিন্তু রপ্তানির ক্ষেত্রে আমের গায়ে কালো দাগ, ফাঙ্গাস বা অন্য কোনো ক্ষত থাকলে বিদেশি ক্রেতারা তা গ্রহণ করতে চান না। বিমানবন্দরে পাঠানোর আগেও আমকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয়। আমাদের দেশে আমের মৌসুমে তাপমাত্রা প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যায়। এই তাপমাত্রায় আমকে যথাযথভাবে কুলিং না করলে অল্প সময়ে গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। তাই উৎপাদন এলাকা থেকে প্যাকেজিং সেন্টার, এরপর কুলিং চেম্বার এবং বিমানবন্দর পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা দরকার।

সমকাল: আম রপ্তানির ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াকে নিয়ে আপনারা কী ধরনের কাজ করছেন?

আবু হেনা মোস্তফা কামাল: গত ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বারের সঙ্গে আম রপ্তানি নিয়ে কাজ করছি। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের আমের চাহিদা আছে। ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, হিমসাগরসহ বিভিন্ন জাতের আম নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। মালয়েশিয়ার বাজারে মূল বিষয় হচ্ছে গুণগত মান। আমে ফাঙ্গাস বা কালো দাগ থাকা যাবে না। এ জন্য আমাদের প্যাকেজিং ও সংরক্ষণব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে। কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের গাবতলী ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্টে আম নিয়ে কাজ হচ্ছে। আমের গুণগত মান ধরে রাখা এবং প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে। আমরা চেম্বারের পক্ষ থেকে মূলত ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরির কাজ করছি। এ বছর মালয়েশিয়ার একটি কৃষি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে প্রায় ১০০ টন আম নেওয়ার বিষয়ে কাজ করেছে। আগামী বছর আরও বড় পরিসরে রপ্তানি করার লক্ষ্য রয়েছে।

সমকাল: সম্প্রতি কুয়ালালামপুরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান হালাল বাণিজ্য মেলা মিহাস-এ আপনি অংশ নিয়েছেন। সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি বিদেশিরা ক্রেতারা কেমন আগ্রহ দেখিয়েছেন।

আবু হেনা মোস্তফা কামাল: গত ২৩ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরে মিহাস-এর ২২তম আসর অনুষ্ঠিত হয়। আমরা এই মেলায় শুধু পণ্য প্রদর্শন করিনি, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। এই মেলা আমাদের জন্য বিশ্ববাজারে প্রবেশের বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশে এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সমকাল: হালাল সনদের সঙ্গে কৃষিপণ্যের রপ্তানির সম্পর্ক কী?

আবু হেনা মোস্তফা কামাল: হালাল সার্টিফিকেশন এখন আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা বিভিন্ন পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল সনদের ব্যবস্থা করা গেলে আমাদের রপ্তানি আরও বাড়তে পারে। আমরা বাংলাদেশে আগামী বছরের মার্চে একটি হালাল মেলার আয়োজনের পরিকল্পনা করছি। এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার হালাল ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার চেষ্টা থাকবে।

সমকাল: কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে সরকারের করণীয় কী?

আবু হেনা মোস্তফা কামাল: কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, চেম্বার এবং বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। উৎপাদন এলাকায় কোল্ডস্টোরেজ, প্যাকেজিং ও প্রি-কুলিং সুবিধা বাড়াতে হবে। বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত কুলিং চেম্বার দরকার। রপ্তানির ক্ষেত্রে ফ্রেইট ব্যয় কমাতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান ও সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। 

আরও পড়ুন

×