ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ঋণের সুদে আটকে যাচ্ছে উন্নয়ন

ঋণের সুদে আটকে যাচ্ছে উন্নয়ন
×
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়নের জন্য নেওয়া ঋণ এখন অনেক দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নতুন ঋণ নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের বদলে পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের ‘ওয়ার্ল্ড অব ডেট ২০২৬’ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলো সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে প্রায় ১ লাখ কোটি বা এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। ২০১০ সালে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ১৫ বছরে সুদ পরিশোধের ব্যয় প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোর সরকারি ঋণের গড় সুদের হার ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে গড়ে দ্বিগুণেরও বেশি সুদ দিতে হয়েছে। এই বাড়তি সুদের চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের মৌলিক সেবায়। আঙ্কটাডের হিসাবে, ৫১টি উন্নয়নশীল দেশে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা স্বাস্থ্য অথবা শিক্ষা খাতে সরকারের মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি। এসব দেশে বসবাস করে প্রায় ৩৭০ কোটি মানুষ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সাল থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈদেশিক সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ নতুন করে পাওয়া নিট ঋণের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বিদেশ থেকে নতুন ঋণ এলেও তার চেয়ে বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে আগের ঋণের সুদ পরিশোধে।
আঙ্কটাডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর ফলে বৈদেশিক ঋণ আর উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থ জোগাচ্ছে না। বরং দেশগুলোকে তুলনামূলক বেশি ব্যয়বহুল অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে ঋণের চাপ আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সরকারি ঋণ
শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১১ ট্রিলিয়ন বা ১১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারে। ২০১০ সালে যার পরিমাণ ছিল ৪৯ ট্রিলিয়ন ডলার। মোট সরকারি ঋণের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি উন্নত দেশগুলোর হাতে থাকলেও ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক দ্রুত। উচ্চ সুদের হার, আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে ঋণের ব্যয়, সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ–সব মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

৫০ হাজার কোটি ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের সুদের হার যদি উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি নামিয়ে আনা যায়, তাহলে বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় সম্ভব বলে মনে করছে আঙ্কটাড। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, সুদের হারের ব্যবধান কমানো গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বছরে আনুমানিক ৫০০ বিলিয়ন বা ৫০ হাজার কোটি ডলার সুদ পরিশোধের অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে।
সাশ্রয়ের অর্থ দিয়ে বছরে প্রায় ১৩ লাখ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র অর্থায়ন করা সম্ভব। একই অর্থ দিয়ে প্রায় ১৬০ কোটি শিশুর জন্য ন্যূনতম বৈচিত্র্যময় খাদ্যের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্থাৎ ঋণের সুদের হার কমানো শুধু সরকারের আর্থিক চাপ কমাবে না, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বৈশ্বিক উদ্যোগের তাগিদ
ঋণের উচ্চ ব্যয় কমাতে বৈশ্বিক পর্যায়ে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানিয়েছে আঙ্কটাড। এর মধ্যে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা বা ওডিএ বাড়ানো, বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ বাড়ানো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে কারিগরি সহায়তা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। দেশীয় পর্যায়েও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। ঋণের উচ্চ ব্যয়ের বিরুদ্ধে উন্নয়নশীল দেশগুলোর যৌথভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে আঙ্কটাড। এ জন্য ‘বরোয়ার্স প্ল্যাটফর্ম’ বা ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর প্ল্যাটফর্মকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
আঙ্কটাড বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ সংকট এখন শুধু ঋণের পরিমাণের বিষয় নয়; বরং ঋণের খরচই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। উন্নয়নের জন্য নেওয়া ঋণের বড় অংশ যদি সুদ পরিশোধেই চলে যায়, তাহলে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ সংকুচিত হবে।

আরও পড়ুন

×