ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিশেষজ্ঞ মত

কার্যকর ও সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষায় সংস্কার দরকার

কার্যকর ও সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষায় সংস্কার দরকার
×
×

গোলাম মোয়াজ্জেম, আমিনুল মোহায়মেন

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও  আমিনুল মোহায়মেন

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু কর্মসূচিগুলোর  উপকারভোগী নির্বাচন, খণ্ডিত কাঠামো, অর্থায়ন, সমন্বয় ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো সংস্কারের মাধ্যমে কার্যকর ও সমন্বিত করার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ডকে অনেকেই একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এর মাধ্যমে কর্মসূচি একীভূত করা, সেবা প্রদানের ধাপগুলোতে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা এবং উপকারভোগী নিবন্ধন, যাচাই, অর্থ প্রদান, সচেতনতা ও অভিযোগ নিষ্পত্তিতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার–এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব।

বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি থেকে অধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা
বাংলাদেশের সমাজ মূলত পরিবারকেন্দ্রিক। তাই একই পরিবারের জন্য একাধিক বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি পরিচালনার পরিবর্তে পরিবার ও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে সামাজিক সুরক্ষা সাজানো হলে তা আরও কার্যকর হতে পারে। এর ফলে ভাতাগুলোর দ্বৈততা পরিহার করা যাবে এবং পরিবারভিত্তিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কর্মকাণ্ড আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করা যাবে। বর্তমান কর্মসূচিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে লক্ষ্যগোষ্ঠী ও অধিকারকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে একক কার্ড বা সীমিতসংখ্যক ‘কার্ড’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন সুবিধা ও সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে–যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, শ্রমিক কার্ড, প্রতিবন্ধী কার্ড এবং বঞ্চিত জনগোষ্ঠী কার্ড। একটি কার্ড মানেই সবাইকে একই পরিমাণ অর্থ দেওয়া নয়। বরং এটি হবে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ও সেবায় প্রবেশের একটি প্ল্যাটফর্ম। পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী নগদ সহায়তা, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জীবিকা, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত হতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ড
ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার, নারী ও শিশু, খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিসংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচি ধীরে ধীরে একীভূত করা যেতে পারে। সব পরিবারকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হলেও নগদ সহায়তা থাকবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য। প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য সহায়তা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা ও শিক্ষা সহায়তাও যুক্ত হতে পারে। এভাবে ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি নগদ ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা না হয়ে পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। একইভাবে কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষি পুনর্বাসন, দুর্যোগ সহায়তা, জীবিকা ও কৃষিসেবা এবং শ্রমিকদের জন্য শ্রমিক কার্ডের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, সাময়িক আয় সহায়তা, বেকারত্ব সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অন্যান্য শ্রমবাজার সেবা একীভূত করা যেতে পারে।

প্রযুক্তির মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণে ভুল কমানো
সামাজিক সুরক্ষার ভাতাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ত্রুটি কমাতে সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি এমআইএস ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও সফল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে ভাতাভোগীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা নির্ধারণে আবেদনকারী ও তথ্য সংগ্রহকারীর দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, যাতে উদ্দেশ্যমূলক ভুল তথ্য থাকতে পারে। কিন্তু সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি এমআইএস বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেজের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে গাড়ি, সঞ্চয়পত্র, সরকারি চাকরি বা পেনশনের মতো তথ্য যাচাই করতে পারে। আন্তঃসংযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে ভূমির মালিকানা, বিদ্যুৎ ব্যবহার ইত্যাদি তথ্যও এই এমআইএসে যুক্ত করা যায়। এতে  প্রকৃত দরিদ্র নয়, এমন ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

ইউনিক আইডি কার্যকর করা
একটি কার্যকর ইউনিক আইডি ছাড়া পরিবারের সদস্য শনাক্তকরণ, একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধন রোধ, জীবনচক্রভিত্তিক সুবিধা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার আন্তঃসংযোগ সম্পন্ন করা কঠিন। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ইউনিক আইডি-বিষয়ক আইন পাস করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কারিগরি প্রস্তুতিও সরকারের রয়েছে। ইউনিক আইডি নামে নতুন কোনো আইডি হবে না, বরং বর্তমানের এনআইডি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ইউনিক আইডিতে পরিণত হবে।

সেবা প্রদানের বিভিন্ন ধাপের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস
সামাজিক সুরক্ষার দায়িত্ব আলাদা আলাদা কর্মসূচির পরিবর্তে পুরো ডেলিভারি চেইন অনুযায়ী সাজানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদপ্তর নিবন্ধন ও তথ্য সংগ্রহে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারে। অর্থ বিভাগ অর্থপ্রদান অবকাঠামো পরিচালনা করতে পারে; আর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তাদের বিশেষায়িত সেবা প্রদান অব্যাহত রাখবে। এতে একই কাজের জন্য একাধিক নিবন্ধন ও যাচাইকরণের অবকাঠামোর প্রয়োজন কমবে।

অভিযোগ প্রতিকারের ব্যবস্থা দৃশ্যমান করা
সামাজিক সুরক্ষার অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাকে নাগরিকের কাছে সহজ, দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। কে অভিযোগ করতে পারবেন, কীভাবে করবেন, কত দিনে নিষ্পত্তি হবে এবং অভিযোগের অগ্রগতি কীভাবে জানা যাবে–এসব তথ্য সহজভাবে ব্যাপক গণগোষ্ঠীকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসূচি ও অঞ্চলভিত্তিক অভিযোগের সংখ্যা, নিষ্পত্তি ও অপেক্ষমাণ অভিযোগের তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।

অবদানভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা
বেকারত্ব ও বার্ধক্যের মতো ঝুঁকির ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অবদানভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা চালু করা যেতে পারে। কর্মজীবীরা নিয়মিত অবদান রাখবেন এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে সুবিধা পাবেন। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকার সহ-অর্থায়ন করতে পারে। যারা অবদান রাখতে পারবেন না, তাদের জন্য বিদ্যমান সরকারি সহায়তাভিত্তিক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বীমাভিত্তিক ব্যবস্থা
হৃদরোগ, স্ট্রোক বা ক্যান্সারের মতো বড় রোগ একটি পরিবারকে সহজেই আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলতে পারে। এককালীন চিকিৎসা সহায়তার পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার পরিচালিত স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সামাজিক সুরক্ষায় কর্মসূচিগুলোকে এমনভাবে পুনর্বিন্যস্ত ও সংস্কার করা প্রয়োজন, যাতে এদেশের মানুষের করের অর্থ প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজে লাগে।

  ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
প্রেসিডেন্ট, নলেজ হাব ইনস্টিটিউট
  আমিনুল মোহায়মেন
সামাজিক সুরক্ষা ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ
 

আরও পড়ুন

×