ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

জেনে রাখুন

শেয়ারবাজারের কোম্পানিকে কখন দণ্ডকর দিতে হয়

শেয়ারবাজারের কোম্পানিকে  কখন দণ্ডকর দিতে হয়
×
×

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয়করের হার তুলনামূলক কম। সাধারণত এ হার অতালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় আড়াই শতাংশ কম। তবে পুরো লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করলে এ হার পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। 

এমন ছাড়ের বিপরীতে কর দণ্ডও আরোপ করার বিধান আছে আয়কর আইনে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ নীতিতে স্বচ্ছতা আনা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত মুনাফার ন্যূনতম অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কর আইনে যুক্ত করা হয়েছে বিশেষ বিধান। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত আয়কর পরিপত্রে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আয়কর আইনে বলা হয়েছে, যদি তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ আকারে বিতরণ না করে, তাহলে ওই কোম্পানিকে ১০ শতাংশ দণ্ডকর দিতে হবে। ১০ শতাংশ দণ্ডকর হবে ওই বছরের কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশ এবং বিতরণকৃত লভ্যাংশের পার্থক্যের ওপর।

আবার বিতরণ করা লভ্যাংশের পুরোটা স্টক বা বোনাস লভ্যাংশ দিলে বা লভ্যাংশ টাকায় না দিয়ে সমপরিমাণ মূল্যের শেয়ার দিলে সেক্ষেত্রেও দণ্ডকর দিতে হবে। এক্ষেত্রে দণ্ডকর হবে প্রদত্ত স্টক লভ্যাংশের অর্থ মূল্যের ওপর ১০ শতাংশের সমান। আবার একইসঙ্গে নগদ ও স্টক লভ্যাংশ মিলিয়ে লভ্যাংশ দিলেও যদি নগদের তুলনায় স্টক লভ্যাংশ বেশি হয়, সেক্ষেত্রেও দণ্ডকর দিতে হবে।
নিট মুনাফার পর প্রযোজ্য হারে করপোরেট কর প্রদানের পরও এমন দণ্ড কর আরোপের বিধান করার ব্যাখ্যায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিগুলো যেন কেবল বোনাস শেয়ার বা স্টক লভ্যাংশ দেওয়ার নাম করে কাগুজে লভ্যাংশ দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঠকাতে না পারে, তার জন্য এ বিধান। এর ফলে প্রতিটি কোম্পানিকে অর্জিত মুনাফার একটি ন্যূনতম অংশ নগদ টাকায় বিতরণ করে। এর মাধ্যমে পরোক্ষে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছে সরকার।

দণ্ডকরের হিসাব
ধরা যাক, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এবিসি কোম্পানি এক অর্থবছরে সব ধরনের কর পরিশোধের পর নিট ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করল। আইন অনুযায়ী, কোম্পানিটিকে করপরবর্তী নিট মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৩০ কোটি টাকা লভ্যাংশ হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের দিতে হবে।
দেখা গেল, কোম্পানিটি যে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, তার মোট আর্থিক মূল্য ২০ কোটি টাকা (যার মধ্যে ১৬ কোটি টাকা স্টক লভ্যাংশ এবং ৪ কোটি টাকা নগদ লভ্যাংশ)। এখানে কোম্পানিটি দুটি ভুল করল। প্রথমত–৩০ কোটি টাকার নির্ধারিত সীমার চেয়ে কম (২০ কোটি টাকা) লভ্যাংশ দিয়েছে। দ্বিতীয়ত–নগদ লভ্যাংশের (৪ কোটি টাকা) তুলনায় স্টক লভ্যাংশের (১৬ কোটি টাকা) পরিমাণ বেশি দেওয়া হয়েছে। ফলে কোম্পানিটিকে দণ্ডকর দিতে হবে।

যেহেতু কোম্পানিটি শর্ত ভঙ্গ করেছে, তাই কোম্পানিটির অর্জিত পুরো নিট মুনাফার (১০০ কোটি টাকা) ৩০ শতাংশ বা এক্ষেত্রে ৩০ কোটি টাকা এবং ঘোষিত লভ্যাংশ ২০ কোটির পার্থক্য এর ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। এক্ষেত্রে পার্থক্য ১০ কোটি টাকা হওয়ায় এর ১০ শতাংশ বা ১ কোটি টাকা দণ্ডকর দিতে হবে।

আবার কোম্পানিটি ঘোষিত ২০ কোটি টাকার মুনাফা থেকে ১৬ কোটি টাকার স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়ায়, তা নগদ লভ্যাংশ চার কোটি টাকা থেকে বেশি। ফলে এক্ষেত্রেও দণ্ডকর আরোপ হবে। ফলে ঘোষিত ১৬ কোটি টাকার স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১০ শতাংশ বা ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দণ্ড কর দিতে হবে।
এক্ষেত্রে কোনো কোম্পানি যদি অর্জিত মুনাফার ৩০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দেয়, কিন্তু ক্যাশ ডিভিডেন্ডের (নগদ লভ্যাংশ) তুলনায় স্টক ডিভিডেন্ড বেশি হয় বা পুরোটাই স্টক ডিভিডেন্ড দেয়, তবে ক্ষেত্রে শুধু ঘোষিত স্টক ডিভিডেন্ডের আর্থিক মূল্যের ওপর ১০ শতাংশ করা দিতে হবে।
আয়কর আইনে এ বিধান যুক্ত করা হয় ২০১৯ সালে। অব্যাহত দরপতনের প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারমুখী করতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল জাতীয় বাজেট ঘোষণায় এমন দণ্ডকর আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা ওই বছরের অর্থ আইনে যুক্ত করা হয়। এর পর থেকে এ বিধান চালু আছে।

অন্যান্য প্রযোজ্য কর আইন
কোম্পানি যখন শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ বিতরণ করে, তখন লভ্যাংশ প্রদানের সময়ই উৎস কর কেটে রাখা হয়। নিবাসী ব্যক্তি শেয়ারহোল্ডারের ক্ষেত্রে লভ্যাংশের ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ (ই-টিআইএন থাকা বা না থাকার ভিত্তিতে) উৎস কর কাটা হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর ২০ শতাংশ হারে উৎস কর কাটার বিধান রয়েছে।
অনেক সময় আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানিগুলো প্রকৃত ব্যবসা না বাড়িয়ে কেবল রাইট বা বোনাস শেয়ার ইস্যু করে স্টক ডিভিডেন্ড দিয়ে কোম্পানির ক্যাটেগরি ধরে রাখার চেষ্টা করে। এ বিধানের ফলে এ ধরনের কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের নগদ লভ্যাংশ পাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও লভ্যাংশকেন্দ্রিক বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার চেষ্টা আছে। এই বিধানের ফলে কোম্পানিগুলো তাদের লভ্যাংশ নীতি ও আর্থিক পরিকল্পনা তৈরিতে আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×