সুপারশপ স্বপ্ন ও তার সামাজিক দায়বদ্ধতা
প্রচলিত বাজারের মুরগির দোকান, যেখানে দর-দাম করে কেনাকাটা হয় ফাহাদ বিন সাখাওয়াত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের সর্ববৃহৎ রিটেইল চেইন শপ স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে। স্বপ্ন বিশ্বাস করে, ছোট ছোট উদ্যোগও কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সমাজের নানা স্তরের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সেই দায়িত্ববোধের পরিচয় রেখে চলেছে।
সংসারের নিত্যপ্রয়োজনে কেনাকাটায় গ্রামের হাটবাজার ও শহরের দোকানপাটের ভেতর তেমন পার্থক্য ছিল না মাত্র দুই দশক আগেও। গরমে সেদ্ধ হয়ে বা জলকাদায় মাখামাখি থেকে দরদাম করে কেনাকাটার সংস্কৃতি ছিল প্রতিষ্ঠিত। এই বাস্তবতায় নাগরিকদের জন্য স্বস্তিকর ও আধুনিক বিকল্প গড়ে তোলায় চেইন সুপারশপগুলো ইতিবাচক ভূমিকা রেখে আসছে। এক ছাদের নিচে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং সুপরিকল্পিত সাজসজ্জায় ও একদামে মানসম্মত রকমারি পণ্যের বিকিকিনি চমৎকার সুবিধা এনে দিয়েছে নগরবাসীকে। কার্ডের মাধ্যমে বিল মেটানোর বাড়তি সুবিধাও শহরবাসীরা গ্রহণ করছেন সানন্দে। কেনাকাটার এই রূপবদল আরবান সংস্কৃতিতে যুক্ত করেছে নতুনতর মাত্রা।
আসা যাক সুনির্দিষ্টভাবে স্বপ্ন সুপারশপ প্রসঙ্গে। এটি দেশের সুপারশপ কমিউনিটিতে অন্যতম নেতৃত্বের অবস্থানে রয়েছে। কৃষিপণ্যে বিশ্বস্বীকৃত পদ্ধতির চর্চা, নিরাপদ খাদ্যের অঙ্গীকার এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিবেশগত মান বজায় রাখার নীতি অনুসরণের কারণে স্বল্পকালের মধ্যে স্বপ্ন ব্যাপক নাগরিক আস্থা অর্জন করেছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী এক হাজার স্টোর প্রতিষ্ঠা করেছে। সার্বিক বিবেচনায় তাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে স্বপ্নই দেশের সর্ববৃহৎ সুপার চেইন শপ।
২০১২ সালে স্বপ্ন নিজস্ব ডাইরেক্ট সোর্সিং মডেল গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। এর মাধ্যমে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের আরও কাছাকাছি গিয়ে কাজ করা এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় স্তর কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এর উদ্দেশ্য একটি ভ্যালু চেইন তৈরি করা, যেখানে কৃষকরা আরও ভালো বাজার সুবিধা পাবেন এবং ভোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক দামে আরও সতেজ পণ্য পাবেন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভালো কৃষিচর্চাগুলো স্বপ্নের সোর্সিং ইকোসিস্টেমে যুক্ত করা হয়। এ জন্য দেড় হাজারের বেশি কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ সোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে সংস্থাটির গুরুত্ব মুরগি ও গরুর মাংসের মতো পণ্যেও রয়েছে, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষভাবে গুরুত্ববহ।
নতুনত্ব, আধুনিকতা ও আরবান সংস্কৃতি– এসব বিবেচনায় দেশে সুপারশপ প্রতিষ্ঠা ছিল একটি চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণে অন্যতম পথিকৃৎ স্বপ্ন। যে প্রতিষ্ঠান ক্রমান্বয়ে দেশের সর্ববৃহৎ চেইন শপ হয়ে উঠেছে। ফলে বাজারে নেতৃত্বদানকারী স্বপ্ন সুপারশপের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে পেশাদারিত্ব এবং গ্রাহকসেবার প্রসার ও পরিসর বাড়ানো। সুপারশপগুলো নগর সংস্কৃতিতে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। যে কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগে গ্রাহকের আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে স্বপ্ন কতখানি সফলতা পেয়েছে, সেটি আগামী দিনগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নেও স্বপ্ন অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। বিগত বছরগুলোয় প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড থেকে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্প্রতি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনিশ্চয়তায় পড়া দুই শিশুর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে স্বপ্ন। পরিবারটির জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করতে একটি গাভি উপহার দিয়েছে, যাতে করে গাভি পালন ও দুধ বিক্রির মাধ্যমে পরিবারটি নিয়মিত আয়ের সুযোগ পায়। কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একজন কিশোরীর পড়ালেখার জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকার বৃত্তি দিচ্ছে স্বপ্ন। অর্থাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনা থমকে যেতে বসেছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালীর একজন তরুণের। তাঁর হাতে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেয় স্বপ্ন পরিবার।
চলতি বছর আমের মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সংগৃহীত আম নিয়ে স্বপ্ন একটি ছোট উদ্যোগ নেয় মৌসুমি আনন্দ আরও বেশি মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার। এই আম উৎসব বাস্তবিক অর্থেই ছিন্নমূল শিশুর পাশাপাশি বিত্তহীন পরিবারের শিশুদের জন্য উৎসব হয়ে উঠেছিল। বলা বাহুল্য, এটি শুধু একটি ক্যাম্পেইন নয়; বরং কৃষক, গ্রাহক এবং সমাজের সঙ্গে স্বপ্নের সম্পর্ক আরও অর্থবহ করার একটি প্রয়াস।
স্বপ্ন বিশ্বাস করে প্রত্যেক মানুষের কাজ করার অধিকার আছে। সম্মানের সঙ্গে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার অধিকার আছে। এই বিশ্বাস থেকে বাংলাদেশ বিজনেস অ্যান্ড ডিজঅ্যাবিলিটি নেটওয়ার্ক-বিবিডিএনের সঙ্গে অংশীদারিত্বে স্বপ্ন কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলেছে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য। আজ সারাদেশে স্বপ্নের বিভিন্ন স্টোরে প্রায় শত প্রতিবন্ধী কর্মী কাজ করছেন। তারা শুধু দায়িত্ব পালন করছেন না, প্রতিদিন নিজেদের দক্ষতা, নিষ্ঠা এবং আত্মবিশ্বাস দিয়ে প্রমাণ করছেন সুযোগ পেলে সক্ষমতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
গত মাসে নাট্যাঙ্গনে দীর্ঘদিন অবদান রাখা প্রবীণ ও গুণী শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। স্বপ্ন সুপারশপ থেকে অভিনয়শিল্পী সংঘের ২৫ জন সদস্য বিনামূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। এ ছাড়া ৬০ বছরের বেশি বয়সী শিল্পীরা ৭ শতাংশ এবং সব সদস্য ৫ শতাংশ ছাড়ের সুবিধা পাবেন।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে অত্যন্ত সক্রিয় ও সচেতন স্বপ্ন নানাভাবে সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বাক্ষর রাখছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আসছে বছরের শুরু থেকে দেশের বিপন্ন মেয়েশিশু ও নিপীড়নের শিকার নারীদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সুরক্ষা প্রদান ও প্রতিকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রস্তুতি শুরু করেছে। গতানুগতিক সামাজিক কর্মসূচি পালন নয়, সমকালীন সামাজিক বাস্তবতায় যুগোপযোগী উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বপ্ন ইতোমধ্যে করপোরেট ভুবনে প্রশংসিত হয়েছে।
- বিষয় :
- বাজার