ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সাশ্রয় খুঁজতে হয় পণ্য ধরে, দোকান ধরে নয়

সাশ্রয় খুঁজতে হয় পণ্য ধরে, দোকান ধরে নয়
×
×

প্রচলিত বাজারের মুরগির দোকান, যেখানে দর-দাম করে কেনাকাটা হয় ফাহাদ বিন সাখাওয়াত

 শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

শহরে একটা ধারণা অনেকের মধ্যেই রয়েছে। সুপারশপে গেলে পকেট ফাঁকা, কাঁচাবাজারে গেলে সাশ্রয়। এই ধারণা যাচাই করতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে স্বপ্ন, আগোরা, মীনা বাজারের আউটলেট এবং মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড কাঁচাবাজার, মোহাম্মদপুর কাঁচা বাজার ও টাউন হল কাঁচাবাজারে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম মিলিয়ে দেখা হয়। মোট খরচে চার জায়গায় প্রায় সমান। আসল ফারাক লুকিয়ে আছে আলাদা আলাদা পণ্যে।
স্কুলশিক্ষক জাকিয়া সুলতানা অনেক দিন ধরে এটা টের পাচ্ছেন। তাঁর মতে, সাধারণ কাঁচাবাজার আর সুপারশপের দামের ব্যবধান এখন খুব কম। তাই প্রতি সপ্তাহে তিনি অফার দেখে দুই জায়গার দাম মিলিয়ে তবেই কেনেন। এতে মাসের বাজার খরচ থেকে কয়েকশ টাকা বাঁচে। গতকাল তিনি সুপারশপ থেকে পাঁচ কেজি করে আলু আর পেঁয়াজ কিনেছেন, সঙ্গে অফারের আরও কিছু পণ্য। সবজি কিনেছেন কাঁচাবাজার থেকে।

চার জায়গাতেই পাওয়া যায় এমন আটটি পণ্য নিয়ে একটি ঝুড়ি সাজানো হয়। এর মধ্যে ছিল এক কেজি করে মিনিকেট চাল, দুই রকম মসুর ডাল, পেঁয়াজ ও আলু, এক লিটার বোতলের সয়াবিন, এক ডজন ডিম, এক লিটার দুধ। এই ঝুড়ি কাঁচাবাজারে পড়েছে ৮৯৪ থেকে ৯১৪ টাকা। স্বপ্নে ৯০২ টাকা। আগোরায় স্বাভাবিক দামে ৮৯৪ টাকা, অফারের দামে ৮৮৬ টাকা। মীনা বাজারে ৯২০ থেকে ৯৩৩ টাকা। সবচেয়ে সস্তা আর সবচেয়ে দামি রসিদের ব্যবধান ৪৭ টাকা। স্বপ্নের রসিদ কাঁচাবাজারের পরিসরের মধ্যেই পড়েছে।
দামের সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় আলুতে। কাঁচাবাজারে কেজি ৪০ থেকে ৬০ টাকা, তিন সুপারশপে ২৩ থেকে ৩০ টাকা। টমেটোতে সুপারশপে কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা কম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কারণটা কেনার পথে। সুপারশপ বড় পরিমাণে সরাসরি পণ্য তোলে। অন্যদিকে পাড়ার বিক্রেতাকে পাইকারি বাজার ঘুরে, ভাড়া গুনে মালপত্র আনতে হয়। 
মাছ-মুরগির হিসাব আলাদা। কাঁচাবাজারে ব্রয়লারের দাম জ্যান্ত ওজনে ২০০ টাকা, সুপারশপে চামড়া ছাড়ানো পরিষ্কার মাংস ৩০০ টাকার আশপাশে। তাই এই দুই সংখ্যা সরাসরি মেলানো যায় না। বড় রুই মীনা বাজারে ৩৭৫ টাকা, কাঁচাবাজারে ৪০০ থেকে ৪৬০ টাকার মধ্যে। 

ভোজ্যতেলের বোতলের গায়ে লেখা ২০৪ টাকা। সব জায়গাতেই প্রায় এই দাম মিলেছে। যদিও একই দিন রাজধানীর কয়েকটি বাজারে একই বোতল বিক্রি হয়েছে ২১০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানি সরবরাহ কমিয়েছে, তাদের মুনাফার ভাগও কমিয়েছে। বাধ্য হয়ে তারা পাইকারি বাজার থেকে বাড়তি দামে তেল আনছেন।
জানা গেছে, এই সংকটের পেছনে আছে নতুন দাম বাড়ানোর চাপ। গত ২ সেপ্টেম্বর সয়াবিন তেলের লিটারে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে বোতলের দাম ১৯৯ থেকে ২০৪ টাকা করা হয়েছিল। দুই মাস না যেতেই কোম্পানিগুলো আবার এক লিটারের দাম ২১৮ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতল এক হাজার থেকে এক হাজার ৭০ টাকা আর খোলা তেল ১৮৫ থেকে ১৯৯ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। 
ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইনের হিসাবে, চার-পাঁচটি বড় কোম্পানি তেলের বাজারের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। দোকানে দোকানে তেল খুঁজে বেড়ানোর আজকের ছবি সেই অভিযোগ সামনে আনে।
ডিমে চার জায়গার দাম কাছাকাছি, ডজন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। টানা ছুটিতে ডজন ১৪০ টাকায় নেমেছিল, এখন আবার ১০ টাকা বেড়েছে। কিন্তু যিনি হালি ধরে কেনেন, তাঁর হিসাব ভিন্ন। পাড়ার দোকানে চারটি ডিম কিনলে ডজনের দাম পড়ে ১৬৫ টাকা। যাঁর টাকা কম, প্রতিটি ডিমে তিনিই বেশি দেন।
বিভিন্ন সুপারশপ ও কাঁচাবাজারের দাম বলছে, সুপারশপ না কাঁচাবাজার, এই বিতর্ক আসলে ভুল প্রশ্ন। আলু, পেঁয়াজ, চাল এখন সুপারশপে সস্তা। ডাল কখনও এখানে, কখনও কাঁচাবাজারে। মাছ-মুরগিতে দামের সঙ্গে জুড়ে থাকে কাটা-বাছার বিষয়। জাকিয়া সুলতানার মতো যারা সময় নিয়ে দাম মিলিয়ে কেনেন, তারা কিছু টাকা বাঁচান। সব মিলিয়ে সস্তা খুঁজতে হয় মূলত পণ্য ধরে, দোকান ধরে নয়।

আরও পড়ুন

×