ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গুঁড়া দুধ

৬০০০ কোটি টাকার বাজার

৬০০০ কোটি টাকার বাজার
×

কোলাজ

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ০৪:০৫ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ১০:৫৫

মানুষের দৈহিক বিকাশে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ ও উপাদানে সমৃদ্ধ খাবার হচ্ছে দুধ, যা একটি আদর্শ খাদ্য হিসেবে পরিচিত। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবার জন্যই দুধ পুষ্টিকর খাবার। পুষ্টির চাহিদা পূরণে দিন দিন চাহিদা ও আমদানি বাড়ছে গুঁড়া দুধের। এতে এ খাতের বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুঁড়া দুধের চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। কারও কারও মতে, দেশে বিক্রি করা গুঁড়া দুধের প্রায় পুরোটাই আমদানি করা। সরকার এ খাতে আমদানি শুল্ক কমানোসহ নীতি-সহায়তা দিলে দেশের গুঁড়া দুধের চাহিদা মেটানো সহজ হবে। দামও সাধ্যের মধ্যে রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশীয় দুগ্ধ খাত আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তারা বলছেন, পুষ্টি চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে দুধ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য। শুধু সরাসরি খাওয়ার জন্যই নয়; বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন ঘি, পনির, মাখন, আইসক্রিম, দই, বেকারি পণ্যসহ নানা ধরনের মিষ্টান্ন তৈরিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে দুধ। এ ছাড়া বিভিন্ন রান্না এবং জনপ্রিয় পানীয় চা তৈরিতে দুধের জনপ্রিয়তা রয়েছে। 

কিন্তু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তরল দুধ এই পুরো চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয় বলে বাজার বহুলাংশে নির্ভরশীল গুঁড়া দুধের ওপর। ব্যবহারে সাশ্রয় এবং সহজলভ্যতার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে গত এক দশকেরও বেশি সময়ে গুঁড়া দুধের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।  

বাজারের আকার

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আমদানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গুঁড়া দুধ আমদানি হয়েছে প্রায় চার হাজার ৮১৯ কোটি টাকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকার। 

আমদানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, দেশের চাহিদা মেটাতে গত এক বছরে আনুমানিক এক লাখ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টন গুঁড়া দুধ আমদানি করা হয়। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। সাধারণত অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও পোল্যান্ড থেকে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করা হয়। প্রতিবছর প্রায় ৯ শতাংশ হারে দুধের চাহিদা বাড়ছে। গুঁড়া দুধ আন্তর্জাতিক কোম্পানির এজেন্ট বা ডিলাররা সরাসরি আমদানি করেন। 

দেশীয় উৎপাদক ও কোম্পানির সংখ্যা

স্বাধীনতার এক দশক আগে ১৯৬১ সালে ডানো দুধের মাধ্যমে এ দেশের গুঁড়া দুধের যাত্রা শুরু। পরবর্তীকালে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব ব্র্যান্ড বাজারজাত শুরু করে। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপ দীর্ঘদিন পাউডার মিল্ক আমদানি ও বিক্রি করছে। মার্কস, আমা, স্টারশিপ ও অরা– চারটি ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধ বা মিল্ক পাউডারের মাধ্যমে ভোক্তাদের চাহিদা মিটিয়ে আসছে গ্রুপটি। ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করে মার্কস ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার। প্রিমিয়াম মিল্ক ক্যাটেগরিতে ব্র্যান্ডটি এরই মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। পাশাপাশি বাজারে রয়েছে মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ, আরলা ফুডসের ডানো, নিউজিল্যান্ড ডেইরির ব্র্যান্ড ডিপ্লোমা। এ ছাড়া প্রাণসহ ছোট-বড় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধ পাওয়া যায় বাজারে।

তবে বিএসটিআইর তালিকায় গুঁড়া দুধ পণ্য ক্যাটেগরিতে ১৪টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত। এর মধ্যে মিল্ক ভিটা, আড়ং ডেইরি, আকিজের ফার্ম ফ্রেশের মতো প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কারখানায় উৎপাদন করে। আর বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলো যেমন– নেসলে ও আরলা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাল্ক পাউডার আমদানি করে দেশে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করে। দেশীয় কোম্পানি আবুল খায়ের গ্রুপ মার্কস ব্র্যান্ড নামে গুঁড়া দুধের দেশীয় ব্র্যান্ড বাজারজাত করছে। মেঘনা গ্রুপ করছে ফ্রেশ ব্র্যান্ড।

খাত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ডানো, মার্কস ও ফ্রেশের বাজার হিস্যা খুব কাছাকাছি। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ড হিসেবে রয়েছে ডিপ্লোমা, রেডকাউ ও ফার্ম ফ্রেশ। 

এ খাতের উন্নয়নে কী চান ব্যবসায়ীরা

কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে খাদ্য শ্রেণিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি এ খাতের আমদানিকারক ও বাজারজাতকারীদের। বিশেষ করে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে সহজ করা ও বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীল রাখা দরকার বলে মনে করেন তারা। আমদানিকারকরা বলেন, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সময়ে একাধিক ধাপে আমদানিতে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, যা গুঁড়া দুধ আমদানিকেও বেশ প্রভাবিত করেছে। এ ক্ষেত্রে স্মার্ট ট্যারিফ কাঠামো করা উচিত। বাল্ক আমদানিতে প্রণোদনা ও রিটেইল প্যাকে করভারে ভারসাম্য রাখা দরকার। পাশাপাশি পণ্যের মান ও সার্টিফিকেশন অবকাঠামোর উন্নয়নে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ল্যাব সক্ষমতা বাড়ানো ও দ্রুত ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় দুগ্ধশিল্প উন্নয়নের ফার্ম-টু-ফ্যাক্টরি চেইন, কোল্ডস্টোরেজ, খাদ্য ও বংশবিস্তার উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তারা। 

দীর্ঘদিন আবুল খায়ের গ্রুপ গুঁড়া দুধের ব্যবসা পরিচালনা করছে। এ বিষয়ে আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ও লিগ্যাল প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ সমকালকে বলেন, আমরা বাংলাদেশে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছি। গুঁড়া দুধের বিভিন্ন বিদেশি ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে মার্কস ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ব্র্যান্ড। গুঁড়া দুধের এ খাতটি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আমদানি প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা দরকার। 

শীর্ষ পর্যায়ের একটি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গুঁড়া দুধ আমদানিনির্ভর। পুষ্টি চাহিদা পূরণে সরকারকে এ খাতে নীতি-সহায়তা দিতে হবে। নির্ধারণ করতে হবে যৌক্তিক শুল্কহার। 

বাজারে বর্তমানে তিন ধরনের গুঁড়া দুধ পাওয়া যায়। যেমন হোল ক্রিম মিল্ক পাউডার, স্কিম মিল্ক পাউডার এবং ফিল্ড মিল্ক পাউডার। সাধারণত ১০ টাকার ছোট প্যাকেট থেকে শুরু করে এক-দেড় কেজি ওজনের গুঁড়া দুধের বেচাকেনা হয় বেশি। 

স্থানীয় বাজার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গত ২৪ আগস্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডানো গুঁড়া দুধের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭২০ থেকে ৮৬০ টাকায়, যা গত বছরের এই সময় ছিল ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা। সেই হিসাবে এ দুধের দাম কমেছে ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। গত বছরের এই সময়ে ডিপ্লোমা দুধের কেজি বিক্রি হয়েছিল ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা দরে, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৮৪০ থেকে ৯২০ টাকা দরে। অর্থাৎ দাম বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। একইভাবে বর্তমানে ফ্রেশ ও মার্কসের কেজি বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ৮৩০ থেকে ৮৯০ ও ৮৩০ থেকে ৯০০ টাকা দরে। গত বছরের একই সময়ে এ দুই পণ্যের দাম ছিল যথাক্রমে ৭৮০ থেকে ৮০০ ও ৭৯০ থেকে ৮০০ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে এ দুটি পণ্যের দর বেড়েছে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৮৬ ও ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।

মানহীন গুঁড়া দুধে স্বাস্থ্যঝুঁকি

আমদানিকারক ও বাজারজাতকারীরা বলছেন, এ খাতের বিকাশের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বাজারে খোলা গুঁড়া দুধ বিক্রির পাশাপাশি মানহীন ও ক্ষতিকর পদার্থ মিশ্রিত গুঁড়া দুধ জনস্বাস্থ্যহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্যাকেটজাত পণ্যগুলো অনেক সময় মানদণ্ড অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে না। যথাযথ আইন থাকা সত্ত্বেও এর প্রয়োগের অভাবে ঠকছেন ভোক্তারা। আর অসদুপায় অবলম্বনে আমদানি করে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বাজারে বিক্রি হচ্ছে গুঁড়া দুধ। এর ফলে একদিকে জনস্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, তেমনি সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (গণস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) মো. মোস্তফা বলেন, মানহীন কিছু গুঁড়া দুধ বাজারে বেচাকেনা হয়। এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেকেরই অভিযোগ, গুঁড়া দুধে ফ্যাট কম থাকে। এটি যাচাই করতে চার-পাঁচ মাস আগে দেশের কয়েকটি ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধের প্যাকেট বিএসটিআইতে পাঠানো হয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। বিএসটিআই বলেছে, মান ঠিক আছে। তাই এবার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ চিন্তা করছে প্যাকেট ছাড়া খোলা গুঁড়া দুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।

আরও পড়ুন

×