চুয়েটে ১৫ দিনের অচলাবস্থা
শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে হারাতে যাচ্ছে তিন মাস
সারোয়ার সুমন ও ফাহিম রেজা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩১
গভীর সংকটের দিকে যাচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। টানা ১৫ দিনের অচলাবস্থায় এরই মধ্যে এলোমেলো হয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি অনুষদের অধীনে থাকা ১৮টি বিভাগের একাডেমিক ক্যালেন্ডার। পরীক্ষার সূচিতেও তৈরি হয়েছে জট। আন্দোলনের কারণে শুধু স্নাতক পর্যায়ের ৫০টি সেমিস্টারে ক্লাস হচ্ছে না।
চারটিতে পরীক্ষা শুরু হলেও মাঝপথে তা বন্ধ হয়ে গেছে। আর পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে তা আর শুরু হয়নি ১০টি সেমিস্টারে। চলতি সপ্তাহে এই অচলাবস্থার নিরসন না হলে তারপর শুরু হবে দুর্গাপূজার বন্ধ। তখন বড় সেশনজটের মুখোমুখি হবেন সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থী। তাদের শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাবে অন্তত তিনটি মাস।
পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে গেলেও গত ১৫ দিনে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সমস্যা নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া নিয়োগের ১৫ দিন পরও নবনিযুক্ত উপাচার্য ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি। সার্কিট হাউসে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন তিনি। অন্যদিকে, ২৫ কিলোমিটার দূরে থাকা ক্যাম্পাসে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গতকাল রোববারও শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। আজ সোমবারও রয়েছে এমন কর্মসূচি।
যেভাবে হবে তিন মাসের জট
চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর ও রেজিস্ট্রার কার্যালয় যুক্ত হওয়ায় অচলাবস্থা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এই দপ্তর নিষ্ক্রিয় থাকায় কোনো একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ চলছে না। এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় সচল হলেও ক্লাস ও পরীক্ষা তাৎক্ষণিক চালু করা কঠিন হবে। কারণ, অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই বাড়ি চলে গেছেন। সামনে দুর্গাপূজার ছুটি, অল্প কয় দিনের জন্য বাড়ি থেকে শিক্ষার্থীদের আবার ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনাটা সহজ হবে না। আর শিক্ষার্থীরা যদি না আসেন, শুরু করা যাবে না পরীক্ষাও। সে ক্ষেত্রে অন্তত তিন মাসের সেশনজটে পড়বে চুয়েট।
পরীক্ষার চিত্র
পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই), কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ক্লাস শেষ হয়ে সপ্তম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন শিক্ষার্থীরা।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই), মেটালার্জিক্যাল অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং (এমএমই) এবং মেকানিক্যাল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমআইই) বিভাগে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের বিদায়ী বর্ষের সপ্তম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। আন্দোলনে তা বন্ধ হয়ে যায়। একই চিত্র আছে মাস্টার্স পর্যায়েও।
মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চান শিক্ষার্থীরা
শিক্ষার্থী তানভীর রেজা বলেন, টানা অচলাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমরা ইতোমধ্যে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছি। দ্রুত সমাধান না হলে পূজার ছুটি যোগ হয়ে প্রায় এক মাস একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে থাকতে হবে আমাদের।
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হুমাইরা ইসলাম বলেন, এই ঘাটতি শিক্ষাজীবন আরও দীর্ঘ করবে এবং সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি করছে। মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটে শিক্ষার্থীদের ‘সর্বাত্মক শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে। অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে লাল কার্ড প্রদর্শন, মশাল মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা।
যা বললেন রেজিস্ট্রার ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক
চুয়েটের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. শেখ হুমায়ুন কবীর বলেন, আমি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলাম। পদত্যাগপত্র ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। তাই রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে আমি এখন কোনো কথা বলতে পারব না।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, চলমান আন্দোলন দ্রুত শেষ হলে যে ক্ষতি হয়েছে, আমরা তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব। পূজার বন্ধের আগে অন্তত একটি পরীক্ষা নিতে পারব। কিন্তু পূজার ছুটি পর্যন্ত যদি অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয় তাহলে সমস্যা জটিল হবে।
যা বলছেন নতুন উপাচার্য
চুয়েটের নবনিযুক্ত উপাচার্য সার্কিট হাউসে বসে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছেন দাবি করে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম সমকালকে বলেন, চুয়েটের চলমান সংকট শিগগির শেষ হবে। যদি এটি আরও দীর্ঘায়িত হয় চরম ভুক্তভোগী হবে শিক্ষার্থীরা। তারা সেশনজটে পড়বে। শিক্ষাজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরীক্ষা ও ক্লাস দ্রুত শুরু করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হচ্ছে।
তবে চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, নতুন উপাচার্যের সঙ্গে পরীক্ষা বা অন্য কোনো বিষয়ে আমার কোনো কথা হয়নি।
- বিষয় :
- চুয়েট