ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

নির্জনতার সঙ্গে দেখা

নির্জনতার যৎসামান্য

নির্জনতার যৎসামান্য
×

প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল

আলফ্রেড খোকন

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

হামের টিকা না পেয়ে যে শিশুরা মরে গেল রাজধানীতে এবং বিভিন্ন জেলায়, যে মা ও বাবা আর কোনো দিনও পাবে না তার প্রিয়তম শিশুটিকে, গল্প বলার সান্ধ্যকালীন ঘুমপাড়ানোর মধুর শয্যায়– এর নাম নির্জনতা। সামান্য একটি টিকার জন্য যে মা ও বাবা তার প্রিয়তম শিশুকে হারাল, তারা এখন নির্জনতার টিকা পাবে, পাবে না হারানো শিশুটিকে। 
‘নির্জনতা’ শব্দটি নিয়ে লেখার আগে তার সারমর্ম বলে দিতে চাই– একদিন এই শব্দটি এমন ছিল, যার নাম– নিভৃত পরিবেশ। নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু আহরণ, এমনই ছিল নির্জনতার সুন্দর আভরণ। কিন্তু আমার এই নির্জনতা নিয়ে যা লিখব তা বিভীষিকাময়। নিপাট নির্জনতার কথা বলার আগে আমার জীবনের নির্জনতা নিয়ে দুই একটা কথা বলি।
আমার প্রিয়তম মা যেদিন পার্থিব জগৎ ছেড়ে অপার্থিব জগতে চলে গেলেন, তাঁর শেষকৃত্য শেষ করে আবার এই নগরে ফিরে আসার পর; আমার নিচুতলার ভাড়াবাসার ব্যাচেলর কুঠরিতে আমি যে দৃশ্য রচনা করেছিলাম, সেকথা সামান্য বলি। সন্ধ্যা হয় হয়– এমনি এক নির্জন সন্ধ্যায় মেঝেতে কিছু মোমবাতি প্রজ্বালন করে বসেছিলাম। গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে পত্রিকা ও টেলিভিশনে আমার মায়ের মৃত্যুসংবাদ দিলে তা প্রচার করত। কিন্তু আমি এর কিছুই করিনি। টেলিভিশন স্ক্রলে আমার স্বাক্ষরে প্রচার হয়, কর্মকর্তা থেকে কর্মচারীর স্বজন-কুজনসহ দেশবরেণ্য কত নাম। অথচ আমার মায়ের নাম বা তাঁর কথা কোথাও প্রচার করিনি। কেন করিনি? এর মানে নির্জনতা– সেই নির্জনতার পায়ের কাছে বসে থেকে যে মোমবাতি জ্বালে, সেই মোমের আলোয় তার নাম প্রচারিত হয়। এমন মায়ের কথা প্রচারের জন্য গণমাধ্যম লাগে না। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞান। 
মা-হারা এক নির্জন সন্ধ্যায়, আমাকে সমবেদনা জানাতে আমার ভাড়া বাসায় এসেছিল বন্ধু, কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল। সে এসে দেখল, ঘর অন্ধকার করে, আমি কিছু মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখে তার চারপাশে বসে আছি। কামাল এসে আমার এই দৃশ্য দেখে সেও বসে পড়ল কোনো কথা না বলে। ব্রাকেটে বলে রাখি, কামাল আমার জন্মদিনে এই কথার কিছু অংশ লিখে ফেসবুকে প্রতিবছর রি-পোস্ট করে। এ ক্ষেত্রে আমার কিছু নির্জনতা ক্ষুণ্ন হয়। কিন্তু, কিছু নির্জনতা জীবনে আছে, যা কেউ ক্ষুণ্ন করতে কোনোদিনও পারে না। এমত অবস্থায়, নির্জনতা নিয়ে যখন সমকালের কালের খেয়ার অনুরোধ আসে– লিখে দিন নির্জনতা– তখন জনশূন্য সন্ধ্যায় আমার পক্ষে কী কী নির্জনতা বলা সম্ভব? এমন কিছু নির্জনতা আছে, যা নিয়ে লিখতে গেলে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তোমাকেই নির্জনতার বনবাস দিয়ে দেবে। এমন নির্জনতার কথা লিখতে না-পারার নাম নির্জনতার বনবাস।
এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে, ছোটবেলার শিশিরসিক্ত ঘাস, যা আমি মাড়িয়ে দেওয়ার ছলে নিজেরই নাম লিখে আসতাম। আপনারা ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুকে ঠেলে পা বা হাত দিয়ে কখনও কি নিজের নাম লিখেছিলেন? আমি লিখেছিলাম। ঘাসের ডগায় শিশিরে লেখা নাম মুছে গেলে এমন এক দেনা বাড়ে– যার নামও নির্জনতা। যেমন সমুদ্রপাড়ের বালুতটে নিজের নাম, পদচ্ছাপ কিংবা প্রেমিকার নাম লিখে দেওয়ার পর ঢেউ এসে মুছে দিয়ে যায়! এই মুছে দেওয়া ঢেউয়ের আরেক নাম নির্জনতা। 
এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে, কবি ওমর খৈয়ামের নাম– তাঁর রুবাইয়াৎ থেকে এই কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এই কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতেও অন্যরকম এক ধরনের নির্জনতার আভাস পাই, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যেমন–
‘এই নিরালায় পাতায় ঘেরা বনে ধারে সবুজ ছায়
মদের জাম আর খাদ্য নিয়ে কাব্য পড়ি দিনটা যায়
নির্জনতার নেকাব ছিঁড়ি গুঞ্জে তব মুঞ্জে সুর
সেই তো সাকি স্বপ্ন আমার সেই বনানী স্বর্গপুর’। 
নির্জনতার অবগুণ্ঠন মুক্ত করাও এক ধরনের নির্জনতার ভিতর প্রবেশের পথ, যে পথ ওমর খৈয়াম দেখিয়েছেন। আবার মনে পড়ছে কবি জীবনানন্দ দাশের সেই দিন এই মাঠ কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি–
‘সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি–
এই নদী নক্ষত্রের তলে
সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন–
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
আমি চলে যাব ব’লে
চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে?
লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে?
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!’
এই যে ‘আমি চলে যাব ব’লে/সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!’ এখানেও রয়েছে নির্জনতার তুমুল নিনাদ। 

এই নির্জনতাও তো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এটা কেবল অন্তর দিয়ে অনুভব করা যায়– নির্জনতা এরকম অনুভবের নাম। আবার এ এক ধরনের স্তব্ধতারও নাম। যে পৃথিবীতে একজন চলে যায় স্তব্ধতার দিকে, কিন্তু তবুও পৃথিবী আরেকজনকে নিয়ে কোলাহল করে ওঠে। ফলে কোলাহলের ভিতরই নির্জনতা বেড়ে উঠতে থাকে। নির্জনতার আরেক মানে চিরপ্রস্থান। আমার একটি কবিতায় লিখেছিলাম– নির্জনতা কবে তুমি আসবে বল তো! কোনো এক কাব্যগ্রন্থে এ কবিতা মুদ্রিত রয়েছে। যে তুমি পড়বে এসে, সেই তুমি নির্জনতায় হবে নির্বাসিত। পার হওয়া শতাব্দীর পর আবার আরেকটা শতাব্দী আসে এবং সেও চলে যায়। সেখানে কত ঝড়! রাজায় রাজায় যুদ্ধ বাধায়। বনের উলুখাগড়া হয় শেষ। যুদ্ধের পর পড়ে রয় ধ্বংসাবশেষ– যার নাম নির্জনতা। যেমন ইরান-লেবাননে ইসরায়েল ও আমেরিকা যুদ্ধ করছে– এতে আসলে মরছে সাধারণ জনগণ। উভয় পক্ষের কিছু সেনাও হতাহত হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু তারাও সাধারণ। যুদ্ধই তাদের জীবিকা। এই জীবিকায় লড়াই শেষে যাদের মৃতদেহ কফিনে ফিরিয়ে দিচ্ছে ঘরে, এই ফিরিয়ে দেওয়া কফিনের নাম নির্জনতা। আর যুদ্ধ শেষে যে সৈনিকেরা ফিরে যাবে স্বদেশে কিংবা ব্যারাকে, আবার করবে নতুন কোনো আয়োজন। তারা মনে নিয়ে বেড়াবে বিগত যুদ্ধের বিভীষিকা– এরও নাম নির্জনতা। তারা কোনোদিনও তার প্রিয়তম শিশুটির কাছে, প্রিয়তম বধূটির কাছে, প্রিয় বন্ধুর কাছে, প্রিয়তম মা-বাবার কাছে বলতে পারবে না যে সেও একজন হন্তারক ছিল– এই বলতে না-পারা নিয়ে একটা জীবন বয়ে বেড়ানোর নাম– দুঃসহ নির্জনতা। যুদ্ধ শেষে সৈনিকের বেঁচে যাওয়ার নাম– নির্জনতা। খুন করে বেঁচে যাওয়া খুনির নাম– নির্জনতা। ধর্ষণ করে বেঁচে যাওয়া ধর্ষকের নাম নির্জনতা। ক্ষমতার হাতের তালুতে লেখা– নির্জনতা। কারখানায় ন্যায্য মজুরি না পাওয়া শ্রমিকের ঘামে লেখা– নীরব নির্জনতা। উদ্ধাস্তু মানুষের ভিক্ষার থালায়, সিকি ও আধুলি যেমন ঝনঝনায়– সেই ঝনঝনানোর নাম নির্জনতা। মানুষের পক্ষে, স্লোগানে স্লোগানে প্রতিবাদের তুমুল মিছিল শেষে যারা হাত বদলায়, সেই বদলানো হাতের তালুতে লেখা গাঢ় নির্জনতা। তোমার জন্য কবিতা লিখে অকালে মরে যাওয়া কবি আবুল হাসানের নাম– নির্জনতা। শামীম কবিরের রচনা সমগ্রের ওপর লেখা– নির্জনতা। গভীর শীতের রাতে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রাস্তার ধারে উলঙ্গ শিশুটি’র নাম– নির্জনতা। তোমাকে যে এই মুহূর্তে বিনা কারণে অপমান করে ঘরে ফিরে, হাত ধুইয়ে বসে গেল ডিনারের টেবিলে, এই টেবিলে যে নির্জনতা তার ব্যাখ্যা নেই কোনো; এমত ঘটনার কাছে একমাত্র নির্জনতা এসে মুচকি হাসে! এমন নির্জনতার নাম– বিস্ময়। ফলে, নির্জনতা মানে বিস্ময়। ধরো, তোমার রাতের টেবিলে কত খাবারদাবার, মেহমানরা না খেতে পেরে করছে অপচয়। ধরো, কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনের পাশে কতগুলি কিশোর খাবার না পেয়ে, পলিথিনে মোড়ানো বাবা নামের নেশা খায়। এই নেশার নাম নির্জনতা। আমি প্রতিদিন সোনারগাঁ হোটেলের সামনে দিয়ে অফিসে আসি, হঠাৎ ট্রাফিক সিগন্যালে কয়েক মুহূর্ত বসে থেকে রাস্তার ডিভাইডারে ওদের দেখি– রাষ্ট্রের কাছে ওই ছেলেমেয়েদের কোনো নামঠিকানা নেই, আমার ছেলেটি একদিন জিজ্ঞেস করল– ‘বাবা, ওরা কারা?’ আমি তাকে বলেছিলাম– ‘ওরা সর্বহারা।’ তখন কিশোর ছেলে আবার জানতে চাইল– ‘সর্বহারা মানে কী?’ আমি তাকে বলেছিলাম– এর দুটি মানে। একটি মতাদর্শিক কারণে যারা সর্বহারাদের পক্ষে লড়াই করে, আরেকটি ‘সর্বহারা মানে নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত। যার কেউ নাই।’ ছেলেটি তখন আমার চোখের দিকে চেয়ে বলল– ‘তাহলে ওই সর্বহারারা তো এতিম। ওদের বাবা-মা নেই, থাকার জায়গা নেই, এতিমেরা সর্বহারা? মতাদর্শ মানে কী?’ আমি এই ছোট্ট কিশোরকে কোনো সঠিক উত্তর দিতে পারিনি। না কোনো এতিমের মানে, না কোনো মতাদর্শিক সর্বহারার মানে। এই বলতে না-পারার নাম মানেহীন নির্জনতা। আমি যা বলতে চাই, তা বলতে না-পারার নাম নির্জনতা। তোমার দুঃখের দিনে পাশে থাকতে না-পারার নাম নির্জনতা। তোমার ন্যায়ের পাশে, অন্যায় যখন করে আস্ফালন, সেখানে আমি যখন নীরব– এই নীরব থাকার নাম– নির্জনতা। তুমি আমাকে বলতে চাও, তোমার মনের কথা, অথচ বলতে পারছ না, এই বলতে না-পারার নাম– নির্জনতা। আমি তোমাকে বলতে চাই, অথচ বলতে পারছি না, এই বলতে না পারার নাম– নির্জনতা। 
নির্জনতা আমার শৈশবের একটি গাবগাছ। চৈত্রদিনের বিকেলে, আমি আজও সেই গাছের ডালে মনে মনে ঘুমায়ে পড়ি। মনে মনে আমার ‘নির্জনতা’ রচনা করি। সেই গাছে রয়েছে অনেক কালের ভূত-পেত্নি, নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যাওয়া লোটন চক্রবর্তীর ফ্রকপরা স্মৃতি। এইখানে নির্জনতার মানে একটি ফ্রকপরা স্মৃতি।
নির্জনতা মানে আমার ছেলেবেলা ধু-ধু মাঠের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি তালগাছ। তালপাতায় লেখা স্বরবর্ণের নির্জন অক্ষরগুলি। এখন কম্পিউটারের কিবোর্ডে কম্পোজ হচ্ছে রাতে, তারপর ছাপা হবে কালের পাতায়, তারপর ক্রমশ ধূসর হতে হতে একদিন দাঁড়িয়ে পড়বে নির্জনতার সভায়। 

আরও পড়ুন

×