ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে

অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে
×

শিল্পকর্ম :: নাজিব তারেক

সাজিদ উল হক আবির

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

আনোয়ারকে যারা ওপরে ওপরে চেনে, তাদের কাছে লোকটা একটু স্লো। ঢিলা বললে কথাটা নেতিবাচক শোনায়। ইংরেজিতে ‘স্লো’ বললে বিষয়টা ঠিক দোষারোপের পর্যায়ে থাকে না। আনোয়ারকে দোষারোপ করা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে একটা কাজে সাধারণ একজন মানুষের যতটুকু সময় লাগে, আনোয়ারের লাগে তার মোটামুটি দেড়গুণ। যারা আনোয়ারকে আরেকটু তলিয়ে চেনে, তারা জানে সমস্যাটা কাজের গতিতে নয়, বরং আনোয়ারের অর্ডার অ্যানালাইসিস, আর মাইক্রোম্যানেজমেন্টে। ওকে কোন প্রশ্ন করলে সেটা প্রসেস করতে ওর বেশ সময় লাগে, উত্তর দেয় আরও ভেবেচিন্তে। কোন কাজ দিলে এতোটা খুঁটিয়ে সেটা করে যে বাকিরা অধৈর্য হয়ে যায়।     
যে ইউনিভার্সিটিতে আমরা শিক্ষকতা করি, সে ইউনিভার্সিটির জুনিয়র পর্যায়ে এমনিতেই কোর্স লোড বেশী। তার উপর পড়া - পড়ানোর বাইরে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো থাকে প্রশাসনিক কাজের চাপ। থাকে বিভিন্ন ছুতোয় ইনক্রিমেন্ট বন্ধের পায়তারা। এজন্য ছুটির পর কেউ এক মিনিটও অফিসে থাকতে চায় না। রেগুলার ওয়ার্কিং ডেতে ক্লাস নেয়ার প্রস্তুতি, ক্লাস নেয়া, খাতা দেখা, মিটিং অ্যাটেন্ড করা, সেমিনার - কনফারেন্সে অংশ নেয়া বা আয়োজন করা, পেপার পাব্লিশ করা - এ সবকিছুতে আমাদের এত ব্যস্ত থাকতে হয় যে, কোন কাজই ঠিক গুছিয়ে করা হয়ে ওঠে না। কাজের চাপ আমাদের ভাসাতে ভাসাতে যে কুলে ইচ্ছা, নিয়ে ফেলে। কিন্তু এই আনোয়ার, শালা সপ্তাহে অন্তত একদিন সময় বের করে  ওর কিউবিকলে ডেক্সের ওপর সবগুলো ফাইল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে স্টুডেন্টদের কুইজ, মিড, অ্যাসাইনমেন্ট আর টার্মপেপার - কোর্স রেজিস্ট্রেশনের সিরিয়াল ধরে ধরে গোছায়। তখন আমরা সবাই স্বেচ্ছায় ওর কিউবিকল এড়িয়ে চলিয়ে। ঐ সময় ওকে দেখলেই আমাদের গা রাগে রি রি করে ওঠে। এই ধরণের ওভার সিরিয়াস কলিগদের জন্য বসেদের কাছে আমরা বদনাম হই। 
তবে নতুন কোন জুনিয়র কলিগ আমাদের ডিপার্টমেন্টে জয়েন করলে না জেনেই অনেকসময় ঐ ব্রাম্মমুহূর্তে আনোয়ারের কিউবিকলে উঁকি দিয়ে বেকুব হয়ে যায়, এবং হতাশ হয়ে ফিরে আসার আগে  হঠাৎ করে তার চোখে পড়ে যায় আনোয়ারের কিউবিকলের দেয়ালে প্রিন্ট করে সাঁটা এই পঙ্‌ক্তিগুলো–  
‘আমি অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;/আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,/পৌঁছে অনেকক্ষণ ব’সে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।/জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা/অন্য সবাই এসে বহন করুক : আমি প্রয়োজন বোধ করি না:/  
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ/হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে/নক্ষত্রের নিচে।’ 
ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের এক ফ্যাকাল্টির ডেস্কে অদ্ভুতুড়ে বাংলা পঙক্তি, তাও কোন ছন্দমিল নাই! নতুন কলিগ দ্রুত গুগলের শরণাপন্ন হয়, এবং আবিষ্কার করে, লাইনগুলো জীবনানন্দ দাসের। তারপর শুকনো মুখ করে আমাদের সামনে এসে পুরো ঘটনা খুলে বলে। আমরা তখন সামগ্রিকভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে সমস্যাটা শুধু ঢিলেমি বা মাইক্রোম্যানেজমেন্ট নয়। আনোয়ার ভিন্ন ধরণের এক বিহ্বলতায় আক্রান্ত। 
কাজেই আমরা যখন শুনেছিলাম যে আনোয়ার সেদিন আফতাবনগর - বনশ্রী আইডিয়াল সাঁকো পেরিয়ে বনশ্রী সি ব্লকে উপস্থিত হলে সাঁকোর গোড়ায় অপেক্ষারত অসংখ্য অটোরিকশা চালকেরা তাকে ইশারায়, চিৎকার করে, ক্ষেত্রবিশেষে টানটানি করে নিজ বাহনে ওঠাতে চাইলেও আনোয়ার তাদের হাঁক ডাক এড়িয়ে একটা পায়ে টানা রিকশার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, এবং বলেছিল  - ‘ভাই, দক্ষিণ বনশ্রী জোড়া খাম্বার পাশে, মিশেল ফুঁকো ক্যাফেতে যাবেন?’, ঘটনাটি আমাদের বিস্ময়কর লাগে নি। বরং আমাদের মনে হয়েছিল, পায়ে টানা রিকশার সঙ্গে আনোয়ারের সম্পর্ক মিথোজীবীতার।  রিকশাওয়ালাদের ঘামে ভেজা শরীর - মুখের আড়ালে এক অদৃশ্য নান্দনিকতা আছে। কেবলমাত্র এই বাহনটি ই পারে, দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা হালফিলের পৃথিবীর গতি কমিয়ে আনতে। আনোয়ার সেটা উপলব্ধি করেই হয়তো বারে বারে এই বাহনটি বেছে নেয়।        
ফেসবুকে আনোয়ারের লেখাপত্রের ওপর চোখ বুলালে আঁচ করা যায়, জেনারেশনাল গ্যাপ ওর একটা সংকটের জায়গা। 
অপেক্ষাকৃত স্থির, কিংবা ঢিমেলয়ের নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা এক মিলেনিয়াল যদি একুশ শতকের দ্রুততার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে খাবি খায়, তাহলে তাকে ঠিক দোষ দেয়া যায় না। অ্যালগরিদমের ছায়ার হাটবাজারে আজ সবাই কেউকেটা হলেও, মিলেনিয়ালদের বেড়ে ওঠার সময়ে পৃথিবী এতটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল না। হাতে কোন স্মার্টফোন ছিল না, যাতে ইন্সটল করা সবগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটু পরপর জিজ্ঞেস করে - ‘হোয়াটস ইন ইওর মাইন্ড?’  
আনোয়ারের পক্ষে আজকের পৃথিবীতে খাপ খাওয়ানো এ জন্যেও মুশকিল যে -  আজকের দিনে সবকিছুর ভ্যালিডিটি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ফ্যাশন ট্রেন্ড থেকে শুরু করে রিসার্চ কিংবা রিলেশনশিপ  - সবকিছুর। সেদিন দেখলাম ও reddit এর একটা লিঙ্ক শেয়ার করলো, ওপরে এই ক্যাপশন দিয়ে - ‘ওহে হারাই হারাই সদা হয় ভয়’ । লিঙ্কে ক্লিক করে দেখি, ও বাবা, ইন্টারনেটের কল্যাণে নারী - পুরুষের সম্পর্কের কতো নতুন নতুন নাম! সিচুয়েশনশিপ, ন্যানোশিপ, ওপেন রিলেশনশিপ, টেক্সটেশনশিপ, বেঞ্চিং, ব্রেড ক্রাম্বিং, লাভ বম্বিং, অরবিটিং, গোস্টিং। এ শহরে প্রতি চল্লিশ মিনিটে যে একটা করে ডিভোর্স ফাইল জমা পড়ছে, তাতে বিস্ময়ের কি আছে? পুরনো কায়দাকানুন তো আর খাটছে না আজকের পৃথিবীতে।                    
সে যাক, নব্বইয়ের দশকে আটক আনোয়ার অ্যাটেনশন ইকোনমির পেছল দুনিয়ায় পা না হড়কে কতোদিন টিকতে পারে - এটা ছিল আমাদের এক পরম আগ্রহের জায়গা। সেদিন দক্ষিণ বনশ্রী অভিমুখে রিকশায় চড়ে বসে কানে হেডফোন গুঁজে সে হ্যারি চ্যাপিনের ‘৭০ দশকের অ্যামেরিকান চার্টবাস্টার ‘ক্যাটস ইন দা ক্রেডল’ গানটা সে শুনছিল বটে, তবে এই ব্যাটাই আবার অফিসের অফিশিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগদান বাধ্যতামূলক ঘোষিত হবার আগে একটা স্মার্টফোন পর্যন্ত কিনতে চায় নি! অফিসে ডিপার্টমেন্ট হেডের শান্টিং খেয়ে এখন যে স্মার্টফোনটা চালায় - এর চে সস্তা আর ঠুনকো মডেল বাজারে আর নেই। তাছাড়া ও মোবাইলে কখনো ডাটা ভরে না।  চব্বিশ ঘণ্টা নেটে কানেক্টেড থাকা ওর কাছে নাকি ঝক্কি মনে হয়। বাসা আর অফিসের ওয়াইফাই দিয়েই কাজ চালায়। গান ইউটিউব কিংবা স্পটিফাই থেকে শোনে না, শোনে ২০০৬ - ০৭ এর মতো মোবাইলে গান ডাউনলোড করে। মুরাদ টাকলার মতো ইংরেজি অক্ষরে বাংলা টাইপ করে।   
যাই হোক, আনোয়ারের সেদিন বনশ্রী সি ব্লক থেকে রিকশা নেয়ার ঘটনা আমরা যখন শুনি, আমরা এই হিসাব মেলাতে পারছিলাম না যে ওর দক্ষিণ বনশ্রীর মিশেল ফুঁকো ক্যাফেতে হঠাৎ কি প্রয়োজন পড়েছিল। কেননা রেস্টুরেন্টটা নতুন, আর আমরা জানতাম যে রেস্তোরা বা কফিশপ বাছাইয়ে সে খুব চুজি। আনোয়ার খুঁজে খুঁজে কেবল পুরনো রেস্তোরাগুলিতেই যেতো যেখানে এখনো ব্যাকগ্রাউন্ডে নব্বই বা বিশশতকের বলিউডের ঢিমেলয়ের প্রেমের গানগুলো বাজে। পুরনো রেস্তোরার পরিচিত ওয়েটারেরা তাকে দেখা মাত্র যে হাসিটা দেয়, তাতেই নাকি তার বহুদিন পর ঘরে ফিরে আসার অনুভূতি হয়। এই অনুভূতি, আর নিজের পছন্দের পুরনো খাবারের স্বাদ নেয়ার জন্যই আনোয়ার কখনো রেস্টুরেন্ট নিয়ে এক্সপিরিমেন্ট করে না। কাজেই, সেদিন ওর দক্ষিণ বনশ্রীর এই নতুন ক্যাফেতে গিয়ে হাজির হওয়ার পিছে, আমাদের ধারণা, কালক্ষেপণই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। কারণ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে আনোয়ার সেদিন যে উদ্দেশ্য নিয়ে বনশ্রী সি ব্লক হতে দক্ষিণ বনশ্রী এসেছিল তা পূরণ করা সম্ভব হতো না। কাজেই সন্ধ্যার মতো দিবারাত্রির মাঝামাঝি এক ট্রাঞ্জিশনাল পিরিয়ডের  অপেক্ষায় আনোয়ারকে ঐ ক্যাফেতে বসে থাকতে হয় এক মগ কফি হাতে। তারপর, সাঁঝের আঁধার ঘনিয়ে আসা মাত্র আনোয়ার ওখান থেকে বেরিয়ে আসে।       
আনোয়ারের মূল গন্তব্য ছিল ঐ ক্যাফেটার ঠিক পেছনের গলি। ক্যাফে থেকে বেরিয়েই আনোয়ার কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট ধরিয়েছিল একটা (আমাদের জানা ছিল না যে আনোয়ার সিগারেট খায়), তারপর পায়ে পায়ে হেঁটে গলির এক তৃতীয়াংশ অতিক্রম করে থেমে গিয়েছিল জনমানবহীন নির্মাণাধীন এক দালানের প্রবেশমুখে। তার কাঁধে ছিল সেইন্ট ঈগল কোম্পানির ঢাউশ একখানা ব্যাগ। অন্যসব স্ট্রেসে আক্রান্ত সময়ের মতোই, মাথায় ঘুরছিল তার সবচে পছন্দের সুপারহিরো, ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক এইচ জি ওয়েলসের অমর সৃষ্টি ‘দা ইনভিজিবল ম্যান’ এর গল্প। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে, ডানে বামে চকিত তাকিয়ে সে দ্রুত ঢুকে পড়েছিল বাড়ির নিচতলায়। পাহারাদার কিছু আগে আনোয়ারের সামনে দিয়ে মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়তে বেরিয়ে গেছে।   
‘৯০ এর দশকে আমরা যখন  বিটিভিতে ম্যাকগাইভার, দা এ টীম, সিন্দাবাদ, রোবোকপ, কিংবা রবিনহুডের মতো সিরিজ, কিংবা ক্যাপ্টেন প্ল্যানেটের মতো সুপারহিরো কার্টুনের অপেক্ষায় থাকতাম, আনোয়ারের তখন টিভি দেখার চেয়েও সময় বেশী কাটত বই পড়ে। 
আনোয়ারের সবসময়ের পছন্দের চরিত্র ছিল এইচ জি ওয়েলসের অদৃশ্য মানব। মহল্লার লোকাল লাইব্রেরীতে এই বইটার অনুবাদ খুঁজে পাওয়ার পর, আজ এই পরিণত বয়সে এসেও আনোয়ার ঐ বইয়ের মূল চরিত্র গ্রিফিনের সঙ্গে যতটা একাত্মবোধ করেছে, আর কোন কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গেই অতোটা মিল খুঁজে পায় নি নিজের। 
নির্মাণাধীন বাড়ির ফলস ছাদের ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে আনোয়ার তার ব্যাগ থেকে মিনি প্রোজেক্টরের মতো দেখতে ছোট একটা যন্ত্র বের করেছিল।

যন্ত্রটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছিল, আঙ্গুল বুলিয়েছিল বাটনগুলোর ওপর, চেক করেছিল ব্যাটারি কাজ করছে কি না। তারপর, যন্ত্রটা মাটির ওপর ঠিকভাবে স্থাপন করার জন্য আসপাশ থেকে দুটো ইটের টুকরা খুঁজে বার করেছিল। যন্ত্রটা ফিট করবার পর ওটার মুখ বরাবর একটা লেজার লাইট অন করে দেখেছিল, সে আলো আনোয়ারের উল্টোপাশে, সুনির্দিষ্ট আরেকটি নির্মাণাধীন বাড়ির দেয়ালে গিয়ে পড়ছে। মেশিনের সক্রিয়তা এবং নিশানা নিশ্চিত করার পর আনোয়ার প্যান্টের পকেট থেকে তার সস্তা স্মার্টফোনটা বের করেছিল আরও একবার। ফোনের বামপাশের বাটনে ক্লিক করা মাত্র কাভারে ভেসে উঠেছিল তার শিশুপুত্রের ছবি। আনোয়ার সিগারেটের পাছায় শেষবারের মতো লম্বা একটা টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল দূরে। 
নিজের ছেলের ছবিটা মোবাইলে জ্বলে ওঠা মাত্র আনোয়ারের বুকে একসময় ছুরি বেঁধার মতো যন্ত্রণা হতো। ইদানীং তার মনে হচ্ছে, বেদনার মাত্রা কিছুটা কমে গেছে। ছবিটা দেখলে আগের মতো কষ্ট তার হয় না। এটা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে ও আলাপ করেছিল। আমি ওকে বুঝিয়ে বলেছিলাম, একবার ভালোবাসি বললে যেমন কথাটা ভারী এবং অর্থবহ শোনায়, একটানা পনেরোবার একই মানুষকে একজায়গায় দাঁড়িয়ে ভালোবাসি বললে কথাটা তার ওজন এবং অর্থ হারায়। একই কথা তার পুত্রের ছবির ক্ষেত্রেও সত্য। একই ছবির দিকে কিছুক্ষণ পরপর তাকালে তা তার প্রতীকী তাৎপর্য হারাবে। কিন্তু আমার ধারণা, আনোয়ার আমার কথাটা মানতে পারে নি। অদৃশ্য মানব গ্রিফিনের বিজ্ঞানে তুখোড় দখল, এবং সমাজের প্রতি তীব্র উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গির কিছুই আনোয়ারের নেই। তবে যতটুকু বেদনা নিজের ভেতর জমা হলে সমাজ থেকে আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়, সেটা তার গত ছ’মাসের নিত্য সঙ্গী। উগ্র দেখনদারীর মচ্ছবে আক্রান্ত পৃথিবীতে আনোয়ারের দেখানোর মতো কিছু ছিলই না কখনো। পূঁজি বলতে কেবল নিজের শিশুপুত্রের জন্য বুক ভর্তি ভালোবাসা। কিন্তু মুদ্রা হিসেবে এই ভালোবাসার বিনিময়যোগ্যতা ঠিক কোথায় আছে তা সে বুঝে উঠতে পারছিল  না।  
মেশিনটার অন বাটনে প্রেস করলে তার ভেতরে ভোঁতা একটা যান্ত্রিক শব্দ শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই  প্রোজেক্টরের আলোর মতো এক শক্তিশালী আলোকরশ্মি মেশিনটার মুখ থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আছড়ে পড়ে নির্দিষ্ট সে নির্মাণাধীন দালানের পাঁচতলার দেয়ালে। আলোটি আস্তে আস্তে ছড়িয়ে গিয়ে পূর্ণতা পেলে বোঝা যায় - ওটা একটা ব্যাট সিগন্যাল। 
ব্যাটম্যান - আনোয়ারের নয়, বরং, আমাদের জানামতে ওর ছ’ বছরের শিশুপুত্রের সবচে পছন্দের সুপারহিরো। ছেলেটা ব্যাটম্যান বলতে পাগল। আনোয়ারকে ওর ছেলের সঙ্গে ছেলের মা, অর্থাৎ আনোয়ারের এক্স ওয়াইফ দেখা করতে দেয় না আজ প্রায় ছ’মাস। আগে যখন কালেভদ্রে দেখা করতে দিতো, তখন আনোয়ার ওকে প্রায়ই ব্যাটম্যানের রেপ্লিকা, ব্যাটম্যানের গাড়িঃ ব্যাট মোবাইল ইত্যাদি কিনে দিতো। বাসায় আনার সুযোগ হলে ব্যাটম্যানের কার্টুনও দেখত সে ছেলের সঙ্গে বসে, কার্টুন নেটওয়ার্কে। এ নিয়েও তাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। পারিবারিক কোর্টে দাঁড়িয়ে ঐ পক্ষের উকিল অভিযোগ করেছেঃ আনোয়ার ঘুষ দিয়ে ছেলেকে হাত করার চেষ্টা করছে। 
আমরা জানতাম, গত ছ’মাস ধরে আনোয়ার বহুভাবে চেষ্টা করেছে ছেলেকে একনজর দেখবার, একবার বুকে জড়িয়ে ধরবার জন্য। কিন্তু নিজের প্রাক্তনের পরিবারের শক্তিশালী বাধার সম্মুখে তার সে চাওয়া অপূর্ণ রয়ে গেছে বার বার। কিছুদিন আগে একবার এই গলিতে বিকেল বেলা সাইকেল চালাতে থাকা নিজের ছেলের সামনে এসে হুট করে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে। কিন্তু সন্তানের সামনে দাঁড়িয়ে সে আবিষ্কার করেছিল, তার নিজের চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়ছে কেবল, ছেলেকে বলার মতো কোন কথা খুঁজে পাচ্ছে না। সম্ভবত তার মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে দূরে থাকার কারণে তার পুত্রের চোখে তার প্রতি আগের সেই মায়া বা ভালোবাসা ঝিলিক দিচ্ছে না। তাতে কৌতূহল আছে, আছে দ্বিধা। আনোয়ারের প্রাক্তন সেদিন আনোয়ারকে দূর থেকে দেখে চিৎকার দিয়ে তার পরিবারের বাকি সদস্যদের না ডাকলেও চলত। তাদের ফোন কলে হুট করে পুলিশ না হাজির হলেও পারতো। কেননা পুত্রের সঙ্গে সেদিন চোখে চোখে আলাপের পরই তার আবারো মনে হয়েছিল, সে বাড়ি ফিরে গিয়ে আরও একবার এইচ জি ওয়েলসের অদৃশ্য মানব বইটি খুঁটিয়ে পড়বে, এবং জানার চেষ্টা করবে আদতেই একটি সায়েন্টিফিক পরীক্ষার দ্বারা অদৃশ্য মানবে পরিণত হওয়া যায় কিনা। কিন্তু থানা থেকে আমরা ওকে ছাড়িয়ে আনার পরেই সম্ভবত আনোয়ারের ভেতর পুত্রের প্রতি অপত্য স্নেহ পুনরায় জেগে ওঠে, সেই স্নেহ তাকে বাধ্য করে পুত্র দর্শনের নতুন, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকি সম্পন্ন একটি পন্থা খুঁজে বার করায়। সে, পৃথিবীর অন্য সকল দুর্বল প্রেমিকদের মতো আশ্রয় নেয় মেটাফরের। অনলাইনে নানা ওয়েবসাইট ঘেঁটে  মাসের বেতনের প্রায় অর্ধেক খরচ করে অ্যামেরিকান এক ডিলারের কাছ থেকে অ্যামাজনে এই ব্যাট সিগনেল ক্রয় করে সে।  
আনোয়ারের ব্যাটম্যান হবার কোন শখ ছিল না। রক্ষা করবার মতো কোন গথাম সিটির দায়িত্ব কেউ তার কাঁধে দেয় নি। নির্মাণাধীন বাড়ির ছায়ার সঙ্গে মিশে সে দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় অদৃশ্য মানব হয়েই। তার বুকভরা আশা ছিল যে পুত্রধন নিজ ফ্ল্যাটের  উল্টো পাশের বাড়ির দেয়ালে আছড়ে পরা ব্যাট সিগন্যাল দেখে হয়তো একবারের জন্যে হলেও বাড়ির বারান্দায় এসে হাজির হবে। সে বহু বহুদিন পর একনজর দেখবে তার ছেলেকে। পুত্রবিচ্ছেদ শোকে জ্বলতে থাকা অন্তর সাময়িক প্রশান্তি খুঁজে পাবে। 
তার ভেতর এই ভয়ও কাজ করছিল যে হয়তো তার পুত্রের নজর এড়িয়ে যাবে এই পুরো প্রচেষ্টা। কে জানে, হয়তো আজ তারা পুরো পরিবারই বাসায় নেই। 
সেদিন পরে যাই হয়ে থাক, আমরা জানি, পুত্রের মতোই, অদৃশ্য মানবের প্রতিও আনোয়ারের ভালোবাসা কমে নি কখনো।     
মিলেনিয়ালরা তাদের পছন্দ খুব ঘন ঘন বদলায় না। 

আরও পড়ুন

×