ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

আইন পেশার ধ্রুবতারা: স্মৃতির আঙিনায় এডভোকেট বদিউল আলম

আইন পেশার ধ্রুবতারা: স্মৃতির আঙিনায় এডভোকেট বদিউল আলম
×

এডভোকেট বদিউল আলম

মোহাম্মদ আবুল হাশেম

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:২৬

চট্টগ্রাম আদালতের লাল দালান, দীর্ঘ বারান্দা, বিচারপ্রার্থীদের কোলাহল আর কালো কোট পরা ব্যস্ত আইনজীবীদের ভিড়– এই দৃশ্যপট কেবল একটি কর্মস্থলের নয়, এটি একটি ইতিহাসের। আজ ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে সময় অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু স্মৃতির মণিকোঠায় আজও অমলিন সেই আশির দশকের দিনগুলো। যখন আমি একজন নবীন আইনজীবী, হাতে সদ্য পাওয়া এলএলবি সনদ আর বুকে এক আকাশ স্বপ্ন ও শঙ্কা। সেই দিনগুলোতে যিনি আমার মতো বহু নবীনের হাত ধরে আইনের দুর্গম পথ চলার সাহস জুগিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন– চট্টগ্রাম বারের কিংবদন্তি তুল্য আইনজীবী, শ্রদ্ধেয় এডভোকেট বদিউল আলম। আজ তাঁর ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই নিবেদন।

১৯৮৫ সালের শেষভাগে আইনশাস্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ চুকিয়ে যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম, তখন জগৎটা ছিল ভিন্ন। বইয়ের পাতার আইন আর এজলাসের আইনের প্রয়োগ– এ দুয়ের মাঝে যোজন যোজন ফারাক। ১৯৮৬ সাল। একদিকে আমি তখন কলেজে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত, যা আমাকে দিচ্ছিল আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্মান; অন্যদিকে আদালতের প্রতি এক অদম্য টান।

পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে কাঁধে ছিল গুরুদায়িত্ব। বাবা সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, ভাইবোনদের পড়াশোনা চলছে। এমন বাস্তবতায় দ্রুত উপার্জনের পথ খোঁজাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু অবচেতন মনে জানতাম, আইন পেশায় ‘শর্টকাট’ বলে কোনো শব্দ নেই। এখানে দক্ষতা আর ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে স্থায়ী সম্মান মেলে না। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে কানে আসে একজন মানুষের নাম– যিনি কেবল মামলা লড়েন না, মানুষ গড়েন। তিনি এডভোকেট বদিউল আলম।

চট্টগ্রাম বার ও সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় ফৌজদারি আইনে তাঁর নাম তখন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হতো। তাঁর যুক্তি, জেরা করার কৌশল এবং আদালতে সংযত অথচ ভরাট কণ্ঠস্বর ছিল নবীনদের জন্য অনুকরণীয়। সিদ্ধান্ত নিলাম, তাঁর সান্নিধ্যেই যাব।

প্রথম সাক্ষাতের দিনটি আজও মনে পড়ে। পরিচয় দিয়ে যখন শিক্ষকতার কথা জানালাম, তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন। কিন্তু তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। নবীন বয়সে সেদিন কিছুটা হতাশ হলেও আজ বুঝি, ওটাই ছিল তাঁর জহুরির চোখ। তিনি যাচাই করেছিলেন– ছেলেটি কি সত্যিই শিখতে এসেছে, নাকি কেবল দ্রুত সাফল্যের মোহে?

তবে রেড বিল্ডিংয়ের আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে দ্বিতীয় সাক্ষাতে তিনি যে বাক্যটি বলেছিলেন, তা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। শান্ত কণ্ঠে জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি উকিল সনদ নিয়েছেন তো?’ আমার ‘জি’ উত্তরের পর তাঁর নির্দেশ ছিল– ‘আগামীকাল থেকে কোর্টে আসবেন।’ ব্যস, এটুকুই। সেদিন বুঝিনি, এই একটি বাক্য আমাকে এক কঠোর শৃঙ্খলার ভুবনে প্রবেশ করাচ্ছে।

তাঁর চেম্বারকে কেবল আইনি পরামর্শ কেন্দ্র বললে ভুল হবে; সেটি ছিল একটি চলমান ল’ একাডেমি। সেখানে শেখার প্রথম শর্ত ছিল– সময়ানুবর্তিতা। আদালত বসার আগেই উপস্থিত হওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। তাঁর দর্শন ছিল স্পষ্ট– ফাইল না পড়ে আদালতে দাঁড়ানো মানে নিজের ও পেশার সম্মান ধুলোয় মেশানো।

তিনি শিখিয়েছিলেন, জেরা মানে কাউকে অপমান করা নয়, বরং সত্য উদ্ঘাটন করা। তাঁর একটি কথা আমার পেশাজীবনের মূলমন্ত্র হয়ে আছে– ‘মানুষের কান্না বোঝা না গেলে আইন বোঝা কঠিন।’ আইনের ধারা তো বইতেও আছে; কিন্তু বিচারপ্রার্থীর চোখের ভাষা পড়ার ক্ষমতা অর্জন করাই একজন আইনজীবীর আসল সার্থকতা। তিনি শিখিয়েছিলেন আদালতে উচ্চস্বরে কথা বলা নয়; বরং যুক্তির তীক্ষ্ণতাই আইনজীবীর আসল হাতিয়ার। বিচারকের প্রতি শ্রদ্ধা আর প্রতিপক্ষের প্রতি সৌজন্যবোধ ছিল তাঁর শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ। তাঁর আইন পেশার পাঁচ দশক পূর্তি উপলক্ষে আমরা, তাঁর শতাধিক জুনিয়র মিলে এক মিলনমেলার আয়োজন করেছিলাম। সেই আয়োজন প্রমাণ করেছিল তাঁর গ্রহণযোগ্যতা। দল-মত নির্বিশেষে বারের সকল আইনজীবী তাঁকে শিক্ষকের মর্যাদায় আসীন করেছিলেন। তিনি ছিলেন এমন এক বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় বহু নবীন আইনজীবী আশ্রয় নিয়ে আজকের দিনে মহীরুহে পরিণত হয়েছেন।

আজকের এই দিনে, যখন আমি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে কাজ করছি, কিংবা অতীতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বা পাবলিক প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করেছি– সবকিছুর মূলে রয়েছে সেই রেড বিল্ডিংয়ের শিক্ষা। চট্টগ্রাম আদালত ছিল আমার নিজেকে গড়ার সিঁড়ি, আর সেই সিঁড়ির প্রধান স্থপতি ছিলেন এডভোকেট বদিউল আলম।

স্যারের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন– একজন আইনজীবীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মামলা জয়ের সংখ্যা নয়, বরং তাঁর চরিত্র ও সততা। এই শিক্ষা যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন আমার পাথেয় হয়ে থাকবে।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ)
সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ
সাবেক জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর, চট্টগ্রাম জেলা।

আরও পড়ুন

×