মারিয়ানের হাতপাখা
মারিয়ান রাম্মোর পাঠানো হাতপাখা
সুরুয খান
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৪ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ২০:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের কথা। ইন্টারনেট-পূর্ব সেই যুগে পত্রমিতালী বা ‘পেনপ্যাল’ ছিল ভিনদেশি বন্ধু বানানোর একমাত্র উপায়। আমি তখন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এক শীতের সকালে গরম চায়ের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে একটি পত্রমিতালী ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ পত্রমিতা খুঁজছেন। বন্ধুদের হাতে প্রায়ই বিদেশ থেকে আসা নীল-সাদা ডোরাকাটা এয়ারমেইল খাম দেখতাম। তাদের মুখের উচ্ছ্বাস দেখে আমার মনেও এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিল–আমিও কি পারি না অচেনা কোনো মানুষের সঙ্গে শব্দের সেতুবন্ধ গড়তে?
সেদিনই উত্তর ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়ার একটি ঠিকানা বেছে নিলাম। বাজার থেকে কিনলাম নতুন রাইটিং প্যাড। এক সহপাঠীর কাছে শুনেছিলাম, ফিকে লাল বা গোলাপি কাগজে লেখা চিঠি নাকি সহজে দৃষ্টি কাড়ে। সেই কিশোর বয়সের রোমান্টিক বিশ্বাস থেকেই প্রথম চিঠিটি লিখেছিলাম ফিকে লাল কাগজে। ‘প্রিয় পত্রমিতা...’ শব্দ দুটি লিখতেই বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণ জেগেছিল। বলার মতো খুব বেশি কথা ছিল না, তবু প্রতিটি বাক্য যেন উঠে আসছিল হৃদয়ের গভীর থেকে। চিঠিটি ডাকবাক্সে ফেলে মনে হলো, এক অজানা দিগন্তের দিকে পা বাড়ালাম।
অপেক্ষার প্রহর খুব দীর্ঘ হলো না। হাজার মাইল দূরের এস্তোনিয়া থেকে উত্তর এলো। সেখানে লেখা ছিল, ‘তুমি আমার ঠিকানা কোথায় পেলে জানি না, আমি তো কোথাও পত্রমিতা খুঁজিনি! তবে অচেনা কারও কাছ থেকে চিঠি পাওয়া সত্যি দারুণ অনুভূতি। যদি তুমি আমাকে বন্ধু ভাবতে চাও, তবে এই আমি, তোমার পত্রমিতা–মারিয়ান রাম্মো।’
সেই চিঠি কতবার পড়েছি, তার হিসাব নেই। এরপর শুরু হলো নিয়মিত চিঠির আদান-প্রদান। আমি খুব সতর্ক হয়ে লিখতাম, কোনো শব্দ যেন তাকে আঘাত না করে।
তবু সে কষ্ট করে দীর্ঘ চিঠি লিখত। পাঠাত নিজের হাতে বানানো ছোট ছোট উপহার। একদিন তার পাঠানো একটি বড় প্যাকেট খুলে দেখি, চমৎকার কিছু স্মারক আর তার নিজের হাতে তৈরি সুন্দর একটি হাতপাখা! মনে হয়েছিল, এত উদার হৃদয়ের মানুষটি নিশ্চয়ই তার উপহারের মতোই স্নিগ্ধ। কৌতূহল জাগত–সে দেখতে কেমন?
অনেক দ্বিধা নিয়ে একদিন তার কাছে একটি ছবি চাইলাম। উত্তরে সে লিখল, ‘এখন আমার কাছে কোনো ছবি নেই। সুযোগ হলে অবশ্যই পাঠাব। তবে জেনে রেখো, আমি সাধারণ এক এস্তোনিয়ান নারী মাত্র।’
এরপর সময় গড়িয়েছে। আমার জীবনে এসেছে চাকরি, সংসার। কিন্তু আমাদের পত্রমিতালী থামেনি। নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড, ছোট উপহার আর খোঁজখবর নেওয়া অব্যাহত ছিল। মারিয়ান যেন পরিণত হয়েছিল আমাদের পরিবারেরই এক অদেখা, পরমাত্মীয়ায়।
বন্ধুত্বের ২২ বছর পর, একদিন এলো এস্তোনিয়া থেকে আসা এয়ারমেইল। প্রেরকের নাম মারিয়ান নয়! অচেনা এক নারীর লেখা ছোট্ট চিঠিতে ছিল এক স্তব্ধ করা খবর–‘আমি মারিয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, গত রোববার বার্ধক্যজনিত কারণে মারিয়ান আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আগস্টে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তোমার প্রতিটি চিঠি পেয়ে সে দারুণ আনন্দ পেত। মৃত্যুর আগে তার শেষ ইচ্ছে ছিল, তার এই ছবিটি যেন তোমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।’
চিঠিটি পড়ে আমার হাত কাঁপছিল। প্যাকেটের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ছবিটি বের করলাম। আমি বাকরুদ্ধ! দীর্ঘ দুই দশক ধরে যাকে আমি এক তরুণী হিসেবে কল্পনা করেছি, যার চিঠির শব্দে যৌবনের কলকাকলি শুনেছি; তিনি আসলে অশিতীপর এক নারী! সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট অবয়ব নেই, আর বন্ধুত্বের কোনো বয়স নেই। আজও যখন পুরোনো চিঠিগুলো খুলে বসি, ড্রয়িংরুমের শোকেসে সযত্নে সাজিয়ে রাখা তাঁর হাতে বোনা সেই হাতপাখাটির দিকে তাকাই–মনে হয় হাজার মাইল দূরের মানুষটি এখনও কোথাও আছেন।
লেখক: বাংলাদেশ বেতার সংবাদদাতা, মানিকগঞ্জ
- বিষয় :
- জীবনের গল্প
- বন্ধুত্ব