ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বীরাঙ্গনার খোঁজে-৩

স্বাধীন দেশে সামাজিক পরাধীনতা

স্বাধীন দেশে সামাজিক পরাধীনতা
×

সুরমা জাহিদ

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৮

যখন কাজটা পুরোপুরি করতে শুরু করি, তখন বীরাঙ্গনারা ছিলেন আড়ালে-অন্ধকারে। বলতে পারি, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে তখন কাজ করতে হবে- এ বিষয়ে কেউ ভাবেইনি। তাই তারা মুখ খুলতে চাননি; কারণ এটা তাদের নিজের লজ্জা। এসব কথা কি মুখে আনা যায়? তা ছাড়া এসব কথা যদি গ্রামে বেশি জানাজানি হয়, তবে তারা আবার নতুন সমস্যায় পড়বেন। তারা সে সমস্যায় জড়াতে চান না। কারণ, পুরোনো ভয় তো তাদের মাঝে রয়েই গেছে। এমনিতেই তো তারা নির্যাতনের শিকার। যে নারীর মান-ইজ্জত থাকে না, তার তো বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই নেই- এটা তারা শুনে এসেছেন যেদিন থেকে তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার পর থেকেই তারা নানাভাবে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।


দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হাজার হাজার নারী ঘরছাড়া হয়েছেন। কারণ সমাজ তাদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছে। আর যারা দাঁতে দাঁত কামড়ে আত্মসম্মানবোধকে মাটিচাপা দিয়ে সমাজে থেকেছেন, তাদের তো প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ ছোট-বড় কত লোকের কত কিছু সহ্য করতে হয়েছে! যেমন এলাকার ছেলেপেলে এমনকি বড়রাও তাদের দেখলে কুপ্রস্তাব দিত। রাতে তাদের ঘরের ওপর ঢিল ছুড়ত। এমন অনেক মা-বোন আছেন, যাদের রাতে ঘর থেকে বের করে ১০-১২ জন মিলে ধর্ষণ করত, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। কিছুই করা বা বলার ছিল না। বিচার চাইবে কার কাছে? কারও কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তো তাদের ছিল না। বাধ্য হয়ে এমন অন্যায়-অত্যাচার মেনে নিতে হয়েছে। যদি মুখ ফুটে কিছু বলতেন, তখনই শুরু হতো আজেবাজে কথা। বীরাঙ্গনারা সমাজ-সংসারে কখনও মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারতেন না। কেউ যদি অন্যায় করত, তারও কোনো প্রতিবাদ করতে পারতেন না। প্রতিবাদ করতে গেলেই তাদের মনে করিয়ে দিত, তুই কলঙ্কিনী, তুই খারাপ মানুষ। তোদের কথা বলার কোনো অধিকার নেই।

কোনো কাজে গেলে তাদের নেওয়া হতো না, অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিত না। এমনকি কোনো শুভ কাজের সময় যদি তারা সেখানে উপস্থিত থাকতেন, তখন তাদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দিত। তাদের সঙ্গে কেউ মিশত না, কাউকে মিশতেও দেওয়া হতো না। তাদের সঙ্গে যে-ই মিশবে সে-ই খারাপ হয়ে যাবে- এমন একটা ভাব তাদের মাঝে কাজ করেছে। কারও বিয়ের প্রস্তাব এলে অন্যরা বিয়ে  ভেঙে দিত। সমাজ তাদের পঙ্গু করে দিয়েছে প্রতিনিয়ত।

আমি যখন তাদের সঙ্গে কথা বলতাম, তাদের সাক্ষাৎকার নিতাম, তখন খুব খারাপ লাগেনি আমার। কারণ তখন আমার মাঝে অনেক কিছু কাজ করত। কীভাবে তাদের কাছ থেকে আমি তাদের সেই সময়ের ঘটনা বের করে আনব, কীভাবে প্রশ্ন করলে তাদের উত্তর দিতে সহজ হবে। কোন প্রশ্নের পর কোন প্রশ্নটা করব, এসব কিন্তু যখন আমি লিখতাম, তখন আমাকে গভীরভাবে শুনতে হতো। এমন বেশ কয়েকটা ঘটনা আছে, যা শোনার পর আমি আর দু-তিন মাস কোনো কিছু লিখতে পারিনি। আমার ভেতরে কেমন যেন লাগত! তা আমি প্রকাশ করতে পারছি না। শুধু ভেতরে ভেতরে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। ভাবতাম, আহা! এটা কী করে সম্ভব! একজন মানুষ হয়ে অন্য একজন মানুষের ওপর পারে এত কিছু করতে! মানুষ যখন পাকিস্তানি আর্মিদের ভয়ে গভীর জঙ্গলে হিংস্র প্রাণীর কাছে আশ্রয় নিয়েছে, তখন কিন্তু জঙ্গলের হিংস্র প্রাণীও মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। হিংস্র প্রাণী তখন মানুষের কোনো ক্ষতি করেনি, যা করেছে পাকিস্তানি আর্মিরা। তাদের এই কষ্ট যত বেশি আমাকে পীড়া দিয়েছে, তত বেশি তাদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। আমার অনেক কষ্ট হতো সত্যিই। ভাবতাম, কত অসহায় হয়ে এসব সহ্য করতে হয়েছে তাদের! বীরমাতারা যখন কথা বলতেন, মাঝেমধ্যে আমি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম। কখনও আমার মুখ বন্ধ হয়ে যেত। কথা বলতে পারতাম না।

এমন অনেক বীরমাতা আছে, তারা তাদের কষ্ট, লজ্জার কথা বলতে বলতে মাঝখানে থেমে গেছেন। আর কথা বলতে পারছেন না। শুধু দু'চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ চেপে ধরেছেন। আঁচল ভিজে গেছে। দু'তিন দিন পর গিয়ে আবার একটু শুনতাম। এমনও কেউ আছেন, দুই মাস তিন মাস পর আবার গিয়েও কথা বলতে পারিনি। এমন অনেকে আছেন, কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। এমন অনেকে আছেন, বলতে ভয় পাচ্ছেন বলে তারা জানিয়েছেন। তাদের চোখের সামনে সব ভেসে আসছে, কীভাবে তাদের নির্যাতন করেছিল। তারা বলেছেন, মনে হলে এখনও রাতে ঘুম হয় না। ভয়ে ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয়, এই বুঝি তারা আসছে। আবার তারা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই বলে ভয়ে কাঁপছেন। আর বলতে পারছেন না। আবার কেউ কেউ ভয়ে চিৎকার শুরু করে দিতেন। কতটুকু কষ্ট হলে এতগুলো বছর পর তারা ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারেন না? ভয়ে চিৎকার, কান্নাকাটি করেন?

খাগড়াছড়িতে এক বীরমাতা আছেন। সত্যিই তিনি বীরমাতা। তার নাম চেন্দাউ মারমা। যুদ্ধের প্রথমদিকে তিনি ধরা পড়েন। তাকে মাটিকাটা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। প্রথমে আট-দশজন ধর্ষণ করে, দিন-রাত সবসময়। তখন তিনি খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন ওই এলাকার মেজর একদিন সেই ক্যাম্পে আসে। তখন ওই মেজর তাকে নিয়ে যায় তার কাছে। তাকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তোলে। তিনি সুস্থ হলে মেজর চেন্দাউ মারমাকে তার কাছেই রাখে। সেই মেজরসহ আরও অনেকে তাকে ধর্ষণ করে। তাকে দিয়ে তাদের কাজকর্মও করাত। তখন চেন্দাউ মারমা সুযোগ বুঝে সেই মেজরকে অনুরোধ করেন, তুমি ও তোমার লোক যত ইচ্ছা তত আমাকে আরও নির্যাতন কর, কিন্তু আমার এলাকার আর কোনো নারীর ইজ্জত নিও না। মেজর তার সে অনুরোধ রেখেছিল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্যাম্প থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তখন তিনি তার মা-বাবা, স্বামীর কাছে ফিরে আসেন। কিন্তু কেউ তাকে আশ্রয় দেয়নি। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। সমাজ তাকে জায়গা দেয়নি। তখন তিনি অসহায় হয়ে অনেক উঁচু একটা পাহাড়ের ওপরে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। দিনের বেলায় মাটি কাটা থেকে শুরু করে কঠিন কাজ করতে শুরু করেন। সারাদিন কাজ করে টাকা নিয়ে বাজার করে আবার পাহাড়ে উঠে যান। আস্তে আস্তে একটা ঘরসহ একটা সংসারে যা যা লাগে, তাই করেছেন তিনি। কিন্তু পরিচিত এলাকায় তিনি আসেন না। লোকালয় থেকে সবসময় দূরে থাকেন। এখনও সমাজ তাকে গ্রহণ করেনি। সেই যুদ্ধের পর আর কখনও তিনি তার আত্মীয়স্বজন, পরিচিত কারও কাছে যাননি। তিনি তার নিজের মতো আছেন।

চেন্দাউ মারমার কথা, আমি আমার ইজ্জত দিয়ে এলাকার হাজারো নারীর ইজ্জত রক্ষা করেছি- এটার কোনো দাম নেই! সমাজের মূল্যায়ন হলো, আমার ইজ্জত নিয়েছে পাকিস্তানিরা। আমি কি ইচ্ছা করে ধরা দিয়েছিলাম? আমাকে জোর করে ধরে নিয়েছে। শত শতবার আমি ধর্ষণের শিকার হয়েছি। আমার কষ্ট হয়নি? এই যে সাত-আট মাস ধরে একটা ক্যাম্পের ভেতরে আটকে রেখেছে; ঠিকমতো খাবার দেয়নি। এ অবস্থায় শুধু একদিন গোসল করার সুযোগ দিয়েছে। এতটি মাস একটা মানুষ গোসল ছাড়া থাকা! কী করব, আমি তো পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে বন্দি ছিলাম। আমি একা ছিলাম, আজও একা আছি এবং এই জঙ্গলে আমার জীবনটা পার করে দিয়েছি। একটা সময় ছিল, একা একা ভয় লাগত। কিন্তু করার তো কিছুই নেই। সারাদিন আমি কাজ করতাম। মাঠে-ঘাটে মাটি কেটেছি। ক্ষেতে-খামারে কাজ করেছি। সন্ধ্যা হতেই পাহাড়ে আমার ঘরে চলে যেতাম। একা একা থাকতে থাকতে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। তা ছাড়া যুদ্ধের পর থেকে কথা তো বন্ধই ছিল বলা যায়। কাজের সময় দু-একটা কথা বলা হতো, শোনা হতো। এখন আর কথা বলতে ইচ্ছা করে না।

চেন্দাউ মারমা যে ঘরে থাকেন, এমন একটা ঘরে মানুষের বসবাস সম্ভব নয়। নামমাত্র এটাকে ঘর বলা যায়। চারপাশটা বিশাল জঙ্গল। পাহাড়টাও অনেক উঁচু। দিনের বেলায় হিংস্র প্রাণীর আনাগোনা দেখা যায়। মশা গিজগিজ করে। পানি, আলোর কোনো ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যা হতেই তিনি শুয়ে পড়েন। খুব বেশি সমস্যা হলে একটা কুপি বাতি আছে, তা কিছুক্ষণের জন্য জ্বালান। এত উঁচু পাহাড়। তাই পানি তুলতে খুব কষ্ট হয়। যতটুকু দিয়ে না চললে নয়, সেটুকুই অনেক কষ্ট করে তুলে নেন। ঘরটার পাশেই রান্না করার একটা ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

ঝড়-বৃষ্টি-শীতে কীভাবে যে জীবনযাপন করেছেন, তা বলে বোঝানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তার একটাই অপরাধ- তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে নির্যাতন করে।

সুরমা জাহিদ: লেখক ও গবেষক



আরও পড়ুন

×