পরিবেশ-প্রতিবেশ
সিলেটের সাদাপাথরের কালো বেদনা
ফাইল ছবি
আলমগীর শাহরিয়ার
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ২১:২৯
আমেরিকান আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে, ‘যেদিন পৃথিবীর শেষ বৃক্ষটি কেটে ফেলা হবে, শেষ মাছটি ধরা হয়ে যাবে, শেষ নদীটির জল দূষিত ও বিষাক্ত করে ফেলা হবে, শুধু সেদিনই মানুষ বুঝবে, টাকা খেয়ে বাঁচা যায় না।’ সভ্যতার ইমারতে দাঁড়িয়ে গৌরব করলেও আমরা সম্ভবত মানুষের সেই অকৃত্রিম সহজাত সুন্দর উপলব্ধি থেকে অনেক দূরে। সীমাহীন লোভ ও লালসার কাছে আমাদের শুভবোধ আজ বিপন্ন। বিপন্ন আমাদের প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় একটি পর্যটন-গন্তব্য সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকা ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর। মাত্র কয়েক মাস আগেও এখানে মেঘালয়-খাসিয়া পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পাহাড়ি ধলাই নদী, স্বচ্ছ জল, সাদাপাথরের বিস্তৃত বিশাল স্তূপ যেন প্রকৃতি নিজ হাতে আপন মহিমায় সাজিয়ে পরিপাটি করে রেখেছিল। যান্ত্রিক সভ্যতার কোলাহল থেকে দূরে সযতনে এক নৈসর্গিক পরিবেশ বিরাজ করছিল সেখানে। ঘুরতে গেলেই দেখে মনে হতো পাহাড়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে সমতলের সরোবর। সাদাপাথর পর্যটন স্পটটি মানুষের নজরে এসেছে খুব বেশিদিন আগে নয়। এক দশকেরও কম সময় ধরে ধীরে ধীরে স্পটটি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সিলেট অঞ্চলে জনপ্রিয় পর্যটন স্পট বললে যার নাম সবার আগে আসত তা হলো জাফলং। সেই জাফলং পাথর ও বালুখেকোদের লাগামহীন লোভে তার শ্রী হারিয়েছে বহু আগে। নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে কিংবা এই শতাব্দীর সূচনালগ্নেও আমরা যে শান্ত স্নিগ্ধ জাফলং দেখেছি, তা মুছে যাওয়া এক স্বপ্নস্মৃতি মনে হয়। জাফলং, সাদাপাথর, বিছনাকান্দি, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী নদী এসব পর্যটন স্পট একই ভৌগোলিক বেল্টে অবস্থিত। মেঘালয় খাসিয়া পাহাড়শ্রেণির পাদদেশে অবস্থিত। এই পাহাড়শ্রেণি বাংলাদেশের সমতলে অনেক নদীর উৎসমুখ। কয়েকদিন ধরে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটন স্পটটির কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আমেরিকা পরমাণু বোমা ফেলার পর যেভাবে তছনছ হয়ে গিয়েছিল, একই হাল হয়েছে জায়গাটির। স্থানে স্থানে বিকট সব ক্ষত, গর্ত হাঁ করে আছে। মনে হবে সদ্যসমাপ্ত যুদ্ধের কোনো ফ্রন্ট ছিল এই সাদাপাথর।
অথচ মাত্র এক বছর আগেও এখানে বিরাজ করেছে নয়নাভিরাম দৃশ্য। সবুজ পাহাড়ের কোলে স্রোতস্বিনী স্বচ্ছ জলের কল্লোল ধারা, কয়েক একর জায়গাজুড়ে বিশাল বিশাল পাথরের নিরবচ্ছিন্ন সারি কিংবা পাথুরে বিছানা, দূরে সারি সারি নৌকা, সারাদেশ থেকে ছুটে আসা নানা বয়সী পর্যটকের উচ্ছল জলকেলি সবই যেন আজ কেবলই স্মৃতি। সাদাপাথর এলাকাটি যেন এক মৃতপুরী আজ। অথচ দেশে কোনো যুদ্ধ হয়নি। বহিঃশত্রু আক্রমণ করেনি। সাদাপাথর কোনো সামরিক স্থাপনা কিংবা নিশানা ছিল না। গেল আগস্টে কেবল একটি সরকার পতন হয়েছে। আরেক আগস্ট আসতে না আসতেই সব শেষ। স্থানীয়ভাবে যারা নিজেদের বর্তমান সরকারের ক্ষমতার ঘোষিত কিংবা অঘোষিত অংশীদার ভেবেছেন, পুলিশ-প্রশাসন ‘ম্যানেজ’ করে তারা মিলেমিশে এই হরিলুট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন। মূলধারার গণমাধ্যম এ নিয়ে নিউজ করেছে। তবু সরকার ও প্রশাসন ছিল বিস্ময়কর রকম নির্বিকার। তাহলে এই ধ্বংস-মৌতাতে তাদেরও নীরব সায় ছিল? প্রতিরোধে যথাসময়ে ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন ওঠে, তাদেরও কি তবে এই লুটপাটে কোনো হিস্যা ছিল? তা না হলে দেশজুড়ে তোলপাড় হওয়ার পর কেন যৌথ বাহিনী মাঠে নেমে বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতো এসে বলে– আপনারা আইন কিংবা পাথর হাতে তুলে নেবেন না।
শুধু সাদাপাথর নয়, বহু বছরের শিল্প ঐতিহ্যের স্মারক সিলেটের ভোলাগঞ্জ টু সুনামগঞ্জের ছাতক বাংলাদেশের একমাত্র রজ্জুপথের (রোপওয়ে লাইন) ভোলাগঞ্জের লোডিং স্টেশনটিও এই সুযোগে ধ্বংস করা হয়েছে। পাথরখেকোদের তাণ্ডবে লুট ও ধ্বংস হয়ে গেছে সেটি। লোডিং স্টেশনটির বিপুল পরিমাণ লোহার যন্ত্রাংশ সব খুলে নিয়ে গেছে, উপড়ে ফেলেছে লুটেরারা। অথচ এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব ছিল সরকারের। প্রশাসন রাষ্ট্রীয় এই বিপুল সম্পদ রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতার কী জবাব দেবে?
একটি পর্যটন স্পট শুধু পর্যটকদের বিনোদনের জায়গা না, সেখানে স্থানীয় নানা স্তরের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন জড়িত থাকে। তাদের কর্মসংস্থানের কথা এখন কে ভাববে? সহাবস্থান ও সংরক্ষণের বদলে প্রকৃতিকে শাসন ও নিশ্চিহ্ন করার কর্মযজ্ঞে যেদিন থেকে মানুষ হাত দিল সেদিন থেকেই মূলত নিজের কবর খুঁড়তে শুরু করেছে। আসুন, দেশের এই পলিটিক্যালি ভালনারেবল সময়ে দেশের গৌরবময় সব ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণ করি। আগলে রাখি। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন স্পটগুলো যাতে দস্যু, ভূমিখেকো, পাথরখেকোদের আদিম ক্ষুধাভর্তি পেটে চলে না যায়, অন্তর্বর্তী সরকার কি আদৌ সেদিকে কোনো মনোযোগ দিচ্ছে?
আলমগীর শাহরিয়ার: বিলেতপ্রবাসী লেখক ও গবেষক
- বিষয় :
- সাদা পাথর
- পাথর উত্তোলন
