স্বাস্থ্যব্যবস্থা: সংকট, নীরবতা এবং রাষ্ট্রের দায়
স্বাস্থ্যখাতের সংকট অনেক সময় নিঃশব্দে তৈরি হয়
তাপস দাস
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:৫১ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:২৩
রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি হচ্ছে নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। সেই দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা। কিন্তু যখন সেই ব্যবস্থার ভেতরেই অদৃশ্য এক ভাঙন তৈরি হয়—ওষুধের ঘাটতি, টিকা অনুপস্থিতি, পরীক্ষার উপকরণের অভাব—তখন তা শুধু একটি খাতের সংকট থাকে না; তা পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার এক গভীর প্রতীকে।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘদিনের কিছু অর্জন ছিল—যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি, শিশুদের জন্য নিয়মিত ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ব্যবস্থা, পরিবার পরিকল্পনায় সাফল্য। এসব অর্জন একদিনে আসেনি; এসেছে পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ফলে। কিন্তু যখন সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়, তখন অর্জনগুলোও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
যক্ষ্মার মতো একটি সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রথম সারির ওষুধের ঘাটতি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। কারণ যক্ষ্মা চিকিৎসা মাঝপথে থেমে গেলে তা আরও জটিল, ওষুধ-প্রতিরোধী রূপ নিতে পারে। ফলে একটি রোগ নিয়ন্ত্রণের বদলে তা নতুন করে বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।
একইভাবে শিশুদের জন্য ভিটামিন এ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ব্যাহত হওয়া নিছক একটি ক্যাম্পেইনের অনুপস্থিতি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামগ্রিক বিকাশের উপর সরাসরি আঘাত। এই ধরনের কর্মসূচি সাধারণত অদৃশ্য বিপর্যয় প্রতিরোধ করে—যখন তা বন্ধ হয়, তখন ক্ষতিগুলোও ধীরে ধীরে, কিন্তু গভীরভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিনের অনুপস্থিতি কিংবা সাপের কামড়ের প্রতিষেধকের ঘাটতি—এগুলো এমন বাস্তবতা, যেখানে একটি সাধারণ দুর্ঘটনা মুহূর্তেই মৃত্যুদণ্ডে পরিণত হতে পারে। একজন নাগরিকের জীবন তখন নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সামর্থ্যের উপর—সে কি বেসরকারি খাতে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবে, নাকি পারবে না। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তখন সমতার জায়গা থেকে সরে গিয়ে বৈষম্যের এক নির্মম আয়নায় পরিণত হয়।
পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ বা যক্ষ্মা পরীক্ষার কার্টিজের মতো বিষয়গুলো শুনতে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলোই একটি দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, রোগ নির্ণয় এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ভিত্তি। এই ভিত্তিগুলো দুর্বল হয়ে গেলে পুরো কাঠামোটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সংকটগুলো এককভাবে ঘটছে না, বরং সমান্তরালভাবে বহু খাতে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি ইঙ্গিত দেয় একটি বৃহত্তর সমস্যা—পরিকল্পনার অভাব, অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থতা, এবং সবচেয়ে বড় কথা, জবাবদিহিতার ঘাটতি।
স্বাস্থ্যখাতের সংকট অনেক সময় নিঃশব্দে তৈরি হয়। এখানে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক শোরগোল কম থাকে, কিন্তু এর প্রভাব গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি। একটি শিশু যখন প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না, একটি রোগী যখন ওষুধের অভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পারে না, অথবা একটি পরিবার যখন প্রতিরোধযোগ্য একটি কারণে প্রিয়জনকে হারায়—তখন সেই ক্ষত সমাজের ভেতরে নীরবে জমা হতে থাকে।
রাষ্ট্র যদি এই সংকেতগুলোকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে সংকট আর নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থা তখন কেবল সেবাদানকারী একটি খাত নয়, বরং জনগণের আস্থা হারানোর একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অতএব, এই মুহূর্তে প্রয়োজন অন্তরবর্তীকালীস সরকারের দায় স্বীকার, নতুন সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ, এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা। কারণ স্বাস্থ্যখাতের ব্যর্থতা কোনো পরিসংখ্যানের ব্যর্থতা নয়—এটি মানুষের জীবনের ব্যর্থতা। আর সেই ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
তাপস দাস: যুব সংগঠক
- বিষয় :
- স্বাস্থ্য
- স্বাস্থ্য খাত
