ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

আবাসিক হলে নারী শিক্ষার্থীর খাবারের দুর্ভোগ

আবাসিক হলে নারী শিক্ষার্থীর খাবারের দুর্ভোগ
×

গওহার নঈম ওয়ারা

গওহার নঈম ওয়ারা

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৬ এপ্রিল বিকেলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে রুমে রুমে অতর্কিত হানা দেয় কর্তৃপক্ষ। সারাদিনের ক্লাস শেষে ছাত্রীরা তখন হয়তো একটু গা এলিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বা পরীক্ষা-ক্লাসের কথা ভাবছিলেন, তখনই চলে এই আচমকা আক্রমণ। উদ্দেশ্য দেশের সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটে দৃশ্যমান কিছু ‘কাজ’ দেখানো। 

অভিযান চালিয়ে কমবেশি ৫০টি রাইস কুকার ও হিটার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ১৫টি ভেঙে ফেলা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের কথা– হলের খাবার প্রায়ই খাওয়ার অযোগ্য এবং কোনো কিচেন সুবিধা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের টাকায় কেনা সরঞ্জামে রান্নার ব্যবস্থা করে আসছিলেন। সেগুলো জব্দ না করে সরাসরি ভেঙে ফেলায় আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন মহানগরে চলমান হকার উচ্ছেদ স্টাইলে চলে এই টিপু সুলতান সিনেমা মার্কা ‘আক্রমণ’– বলেছেন এক বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী।  

অন্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর কী অবস্থা 
দেশের প্রায় সব আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ডাইনিং হলে রান্নাবান্নার রেওয়াজ উঠে গেছে। যেখানে রান্না হয় সেখানে খাবারের মান খুবই অসন্তোষজনক। 

বছর দুয়েক আগে রোজার সময় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি হলের ডাইনিং বন্ধ। শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন তাদের দুঃখের কথা– ‘আমাদের পরীক্ষা থাকায় হলে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, হল খোলা থাকলেও ক্যান্টিন বন্ধ থাকায় সাহ্‌রি ও রাতের খাবার খেতে আমাদের বাইরের দোকানে যেতে হয়। এতে আমাদের অতিরিক্ত টাকা যেমন খরচ হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগও বেড়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থীরা সাহ্‌রির রাতে কোথায় যাবে?’ বাধ্য হয়ে তাদের ঘরের মধ্যেই রান্নার জোগাড় করতে হয়। 

সেবার এক হল প্রভোস্টের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছিল, ক্যান্টিন চালু রাখার জন্য তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। শিক্ষার্থীরাই ক্যান্টিন বর্জন করেছেন। ‘শেরেবাংলা হল ক্যান্টিন বন্ধ রাখা হয়নি, শিক্ষার্থীরা ক্যান্টিনে খেতে আসেন না। আমাদের ক্যান্টিন পরিচালকেরা সাহ্‌রির খাবারের টোকেন বিক্রির জন্য রাত ১১টা পর্যন্ত ক্যান্টিনে থাকলেও কোনো টোকেন বিক্রি হয়নি।’ কর্তৃপক্ষের এ কথার উত্তরে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছিলেন, ‘হল ক্যান্টিনের খাবার খেয়ে রোজা রাখা কষ্টকর। আমরা বাধ্য হয়েই হল ক্যান্টিনের খাবার বর্জন করেছি।’

গত বছর (৯ আগস্ট ২০২৫) বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বর্ষপূর্তির সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে তালা লাগানোর ঘটনা ঘটে। শুরু হয় ১৩ দফা আন্দোলন। এর মধ্যে ছিল পরিচ্ছন্নতা ও হাইজিন নিশ্চিতকরণ, ফিল্টারসহ সুপেয় পানির ব্যবস্থা, মালিকদের অব্যাহতি, নতুন আসবাব ও ফ্যান, শিশুশ্রম বন্ধ, নিয়মিত পরিচর্যা, চারপাশ পরিষ্কার রাখা, কর্মচারীদের আচরণবিধি নির্ধারণ, নতুন দোকান স্থাপন, পুরোনো বাটি পরিবর্তন, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্ন বেসিন স্থাপন। 

নতুন বন্দোবস্তের আশ্বাস, কিন্তু কী করছেন? 
সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হলে খাবারের মান বাড়বে। দু-একটি হলে নেতারা ক্যান্টিন মালিকদের সঙ্গে চোটপাট করে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছেন। একজন নির্দেশ দিয়েছেন– ক্যান্টিনের কর্মীরা কেউ হাফপ্যান্ট পরতে পারবে না; মাথায় ক্যাপ থাকতে হবে ইত্যাদি। হলগুলোর বিশাল আকৃতির জ্বলন্ত চুলাগুলোর পাশে বসে কাজ করার সময় যে গরমের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়, সেখানে সারা শরীর ঢেকে কাজ করতে বলা সহজ, কিন্তু বাধ্য করাটা অমানবিক। 

উপায় কী 
হলের আইনে রান্নার জন্য হিটার, রাইস কুকার ইত্যাদি ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। রুমে রুমে হিটার ব্যবহার শুধু নিরাপত্তার ঝুঁকিই তৈরি করে না; বিদ্যুৎ চুরির কলঙ্কেও কলঙ্কিত হন শিক্ষার্থীরা। মাঝেমধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা রুমে রুমে অবৈধ হিটার উদ্ধারের জন্য আচমকা হানা দেন (হলের ভাষায় ‘রেইড’)। যারা লুকাতে পারেন, লুকান; না হলে ধরা পড়েন। জব্দ হয়ে যায় হিটার, রাইস কুকার।
রংপুরের শিক্ষার্থীরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন। তাদের মতে, হলগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল লাগানো যায়। সেখান থেকে প্রতিটি তলায় একটি কিচেন-কাম ডাইনিং রুমে চার-পাঁচটা চুলায় সংযোগ দেওয়া যায়। এর অনুমতি পেলে কাজটা করার জন্য বাইরের কোনো লোক লাগবে না। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থীরাই পারবেন; তাদের শেখাও হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি বা নকশা নিয়ে একটি ক্যাচাল বাধতে পারে। কিন্তু সে বাধা এমন উঁচু নয় যে, সদিচ্ছা দিয়ে তা ডিঙানো যাবে না। 

এ তো গেল গ্রুপ বা ব্যক্তি পর্যায়ে রান্নার ব্যবস্থা। কিন্তু আগের ডাইনিং হল ব্যবস্থা কি একেবারেই অসম্ভব? শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে সেটাও সম্ভব। ব্যবস্থাপনা শেখার সেখানেও একটা সুযোগ আছে। সুযোগ আছে বন্ধুত্ব আর সহমর্মিতা বিকাশের। তার আগে ছাত্র/ছাত্রী নিবাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, ছাত্র প্রতিনিধি আর ক্যান্টিন পরিচালকদের সঙ্গে সমাধানের পথ খোঁজার জন্য বসতে হবে। স্থানভেদে সমস্যার ধরনে বৈচিত্র্য থাকতে পারে। হলসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির (শিক্ষার্থী, সাবেক/বর্তমান ক্যান্টিন চালক, হাউস টিউটর/অভিভাবক) সঙ্গে কথা বলে ক্যান্টিন অচলের যে কারণগুলো জানা গেছে সেগুলো হচ্ছে: নিম্নমানের খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ; ক্যান্টিন পরিচালকদের আর্থিক লোকসান বা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নতুন চুক্তি না করা; ছুটির সময়ে পর্যাপ্ত ছাত্র না থাকা; অব্যবস্থাপনা ও গ্যাস বা জ্বালানি সংকট। এর কোনোটাই সমাধানের অযোগ্য নয়। 

ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গে মফস্বল থেকে দলে দলে মেয়েরা নিজেদের যোগ্যতায় এসে যোগ দিচ্ছে নানা আলো ঝকঝক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। তাদের জন্য একটা মানসম্পন্ন ন্যায্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কি খুবই কঠিন? 

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক, গবেষক  
[email protected] 
 

আরও পড়ুন

×