মধ্যপ্রাচ্য
মক্কা চুক্তির দক্ষিণ এশীয় তাৎপর্য
জাহিদ হুসেন
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত সপ্তাহে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিটি তাৎপর্যপূর্ণ একটি ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা, যা এই অঞ্চল এবং বাইরের কৌশলগত অবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। যে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এটি বাস্তবায়িত হলো তা কেবল এই অঞ্চলকেই প্রভাবিত করছে না; বরং সমগ্র বিশ্বের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এই তিনটি দেশ মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপে বিস্তৃত।
ভিন্ন ভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও তারা একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে আবদ্ধ হয়েছে। যদিও সৌদি আরব ও পাকিস্তান গত বছর স্বাক্ষরিত একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে আগেই আবদ্ধ ছিল। এবার তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি এই চুক্তির পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে। তিন দেশের সম্মিলিত শক্তি এই জোটকে অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বলয়ে পরিণত করেছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পুরো নথি প্রকাশ্যে আনা না হলেও এতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে– ‘তিনটি রাষ্ট্রের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ তাদের সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে।’ এতে আরও বলা হয়েছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং বাহ্যিক আগ্রাসন প্রতিরোধে একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। তবে সবার জন্য প্রযোজ্য ও অভিন্ন হুমকি ঠিক কোথা থেকে আসছে– সে বিষয়ে চুক্তিতে কিছু বলা হয়নি।
এই প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ এই ত্রিভুজাকার চুক্তিটি এমন এক সময়ে গঠিত হয়েছে, যখন ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল তার দখলদারিত্ব বজায় রেখে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে। এই যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পাকিস্তান ও তুরস্ক তুলনামূলক অনেকটাই এই প্রভাবের বাইরে রয়েছে। মক্কা চুক্তিকে ন্যাটোর ৫ নম্বর আর্টিকেলের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তবে যে কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়ার জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হবে। তাৎক্ষণিক এর বাস্তব গুরুত্ব রয়েছে। যেমন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানো।
নবগঠিত এই প্রতিরক্ষা জোটকে মুসলিম জোট বা আরও সংকীর্ণভাবে সুন্নি জোট হিসেবে আখ্যায়িত করা ভুল হবে। এটি একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমায় এবং ইসরায়েলের দখলদারিত্ব নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ, যারা তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত ইরানের পাল্টা আক্রমণের শিকার হয়েছে, তারাও এই জোটে যোগ দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কতটা নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা নিশ্চিতকারী– তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি এই দেশগুলোকে যাদের অনেকের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে; আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তবে এই নির্ভরতা কমানো মানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।
তিনটি দেশই ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর অহেতুক যুদ্ধ চাপিয়ে এবং ইসরায়েলের দখলদারি এজেন্ডাকে টানা সমর্থন দিয়ে অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছেন। তবে এই জোট গঠন নিয়ে ওয়াশিংটনে এক ধরনের কৌতূহলজনক নীরবতা দেখা গেছে।
৭ আগস্ট যেদিন এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়; ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক টেলিফোন আলাপে তাদের দুই দেশের মধ্যকার বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। এই বছর মোদির ইসরায়েল সফরকালে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য তাদের সম্পর্ক বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল। সেই সফর থেকেই সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হয়। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের মতে, উভয় নেতাই স্বীকার করেছেন– তারা এখন একটি সাধারণ কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা সৌদি অর্থ, তুর্কি ড্রোন এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের এক যৌথ শক্তি।
মক্কা চুক্তি এ অঞ্চলের কৌশলগত পরিমণ্ডলকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। তবে এর সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনা করলে এই অংশীদারিত্ব বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে যায়। যৌথ প্রতিরক্ষা কৌশলে সম্মত হলেও প্রতিটি দেশই তার নিজস্ব দ্বন্দ্ব ও নিরাপত্তা সমস্যা নিয়ে এতে যুক্ত হয়েছে।
এটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে, অংশীদাররা একে অপরের সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়বে কিনা। পাকিস্তানের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি আসে ভারত থেকে। অন্যদিকে ন্যাটো সদস্য তুরস্কের ইজিয়ান সাগরে গ্রিসের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বিরোধ রয়েছে। এমন একটি মতও রয়েছে, বাস্তবে এই চুক্তি তুরস্ক বা পাকিস্তানের চেয়ে সৌদি আরবের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো থেকে তৈরি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা সমস্যা সামলাতেই বেশি কার্যকর হতে পারে। এগুলো এমন কিছু বিষয়, যার জন্য আরও সুসংহত এবং যৌথ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন হবে। এসব প্রশ্ন সত্ত্বেও মক্কা চুক্তিটি এ অঞ্চলের প্রধান শক্তিগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ভাবনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা নির্দেশ করে।
জাহিদ হুসেন: লেখক ও সাংবাদিক; দ্য ডন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- মধ্যপ্রাচ্য