ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যত্নে থাক শিশুর মন

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৫

যত্নে থাক শিশুর মন
×

ছবি:: ইউনিসেফ/কিরণ

 শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৫ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুর মন কচি গাছের মতো। যত্ন, সঠিক পরিবেশ ও পরিচর্যায় বড় হলে যেমন গাছ সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে, তেমনি শিশুর মনও সুস্থ থাকে। কিন্তু এই যত্নে সামান্য ঘাটতি পড়লেই মানসিক অসুস্থতার বীজ অঙ্কুরিত হয়, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশুর ভবিষ্যৎকেও অন্ধকার করে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মানসিক সমস্যার সূত্রপাতই ঘটে শৈশবে। অথচ অভিভাবকরা সচরাচর এগুলো গুরুত্ব দেন না, অনেকেই ভয় পান সন্তানকে ‘পাগল’ বলে চিহ্নিত করা হবে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘শিশুদের মানসিক রোগ মানেই সে পাগল– এই ভুল ধারণা সমাজ থেকে দূর করতে হবে; বরং সময়মতো সঠিক সেবা নিলে শিশুরা সুস্থ জীবন ফিরে পেতে পারে।’

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বৈচিত্র্যময়। স্কুলে মনোযোগের ঘাটতি, আচরণগত সমস্যা, অতিরিক্ত ভয়, মিথ্যা বলা কিংবা চুরি করা– সবই হতে পারে মানসিক অসুস্থতার ইঙ্গিত। কিছু রোগ, যেমন– অটিজম, এডিএইচডি, ডিসলেক্সিয়া ইত্যাদি ছোটবেলায় সঠিকভাবে শনাক্ত করা জরুরি। তা না হলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা তীব্র হয়, পড়াশোনায় ব্যর্থতা বা সামাজিক সম্পর্কের সংকট দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুরা নিজেদের ব্যথা-অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে না; তার বদলে ভিন্ন আচরণে প্রতিক্রিয়া জানায়।

ঢাকার একটি নামকরা স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র রাফি (ছদ্মনাম) সব সময় চুপচাপ থাকে। ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না, সহপাঠীদের সঙ্গে খেলতে যায় না। শিক্ষকরা ভেবেছিলেন, সে হয়তো অলস বা অনাগ্রহী। পরে দেখা গেল, রাফির ডিসলেক্সিয়া আছে, যার কারণে সে পড়তে গিয়ে অক্ষর গুলিয়ে ফেলে। বাবা-মা প্রথমে মানতে চাননি, ‘আমার ছেলে পাগল না’ বলে ক্ষেপে ওঠেন। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শে থেরাপি শুরু করার পর রাফি ধীরে ধীরে পড়াশোনায় অগ্রগতি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে অনেক শিশুই ডিসলেক্সিয়া বা এডিএইচডির মতো সমস্যায় ভুগছে; কিন্তু পরিবার তা গুরুত্ব দেয় না। তারা মনে করে, এটি অলসতা বা অবাধ্যতা। ফলে শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়, পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়।

রাজশাহীর কলেজপড়ুয়া নিশা (ছদ্মনাম) এসএসসি পরীক্ষায় প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল করায় বাবা-মা গালাগাল করেছেন; সঙ্গে উদাহরণ টেনেছেন সহপাঠী কয়েকজনের। তা সহ্য করতে পারেনি নিশা। মা বলেছিলেন, ‘আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারব না।’ কয়েক দিন পর সে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ভাগ্য ভালো, সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। ডাক্তাররা বলছেন, পরিবারের চাপ আর অবহেলার কারণে কিশোর-কিশোরীদের সবচেয়ে বেশি আত্মহননের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কিশোর আত্মহত্যা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার ফল, প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক নির্যাতন– সবই তাদের মানসিক স্থিতি ভেঙে দেয়। যদি পরিবারে আবেগীয় সমর্থন থাকত, তবে এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা যেত।

গত বছর জুলাই-আগস্টের কোটা সংস্কার ও সরকার পদত্যাগের গণআন্দোলন চলাকালে সরকারি হিসাব ও বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন সব বয়সী শ্রেণি-পেশার মানুষ। আহতের সংখ্যা ২২ হাজারেরও বেশি; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই ছাত্রছাত্রী, শিশু-কিশোর। তাদের অনেকেই চিকিৎসা নিয়েছেন, অনেকের চিকিৎসা এখনও চলছে। ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পাই, সারাদেশে কমপক্ষে ৬৭ শিশু-কিশোর নিহত হয়েছে। ১০ জন ছাড়া যাদের সবার শরীরে গুলির ক্ষতচিহ্ন ছিল।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে আরিফের (১৪) বড় ভাই নিহত হয়। ঘটনাস্থলেই ছিল আরিফ, সে নিজ চোখে ভাইকে গুলির আঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছে। এর পর থেকে আরিফ রাতে ঘুমাতে পারে না, দুঃস্বপ্ন দেখে। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে। তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। 

মা বলেন, ‘আমরা বড় ছেলে মারুফের জন্য শোক করতেও পারিনি। কারণ, আরিফের হাসিও ওর বড় ভাইয়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। ও কারও সঙ্গে কথা বলে না।’

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এটিকে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) বলছেন। যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতায় আক্রান্ত অনেক শিশু-কিশোরের মধ্যে এমন উপসর্গ দেখা যায়। তারা দীর্ঘদিন চিকিৎসা না পেলে বড় হয়ে আরও ভয়াবহ মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যার পেছনে প্রধান তিনটি কারণ– পরিবার, শিক্ষা ও সমাজ। পরিবারে বাবা-মায়ের ঝগড়া, শারীরিক শাস্তি, অতিরিক্ত প্রত্যাশা বা উপেক্ষা শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। স্কুলে পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষাভীতি ও প্রতিযোগিতা অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। আর সমাজে রাজনৈতিক সহিংসতা, সামাজিক বৈষম্য ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর মানসিক জগৎকে একাকিত্বে ঠেলে দেয়।

সাধারণত অভিভাবকদের পজিটিভ প্যারেন্টিং এই ক্ষেত্রে অনেক ভালো কাজ করে। সে ক্ষেত্রে সন্তানের দিকে অধিক মনোযোগ দিন এবং সে কেন এই ধরনের আচরণ করছে, সেটি বুঝে তা সমাধানের চেষ্টা করুন।

ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘অভিভাবকরা যদি ছোট থেকেই সন্তানের আবেগ বোঝেন, খোলামেলা কথা বলেন, তবে অনেক সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।’ বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, স্কুলে কাউন্সেলর নিয়োগ দিতে হবে; খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; পরিবারে সন্তানকে শোনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে; রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন জরুরি।

রাফি, নিশা কিংবা আরিফ– এরা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিটি শিশুর গল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলা করলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। প্রতিটি আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য, প্রতিটি ট্রমা নিরাময়যোগ্য– যদি আমরা সময়মতো পাশে দাঁড়াই। শিশুদের হাসি, খেলা ও স্বপ্নকে রক্ষা করাই একটি সুস্থ সমাজ গড়ার প্রথম শর্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, ‘তীব্র শোক বা মানসিক আঘাত পেলে যে ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে অন্যতম ও জটিল একটি রোগ হচ্ছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, যেটিকে সংক্ষেপে পিটিএসডি বলা হয়। এ মানসিক রোগের প্রধান কিছু লক্ষণ হচ্ছে, যে ঘটনা বা অভিজ্ঞতা ব্যক্তির মনে আঘাত সৃষ্টি করেছে, তা বারবার ফিরে আসে। ঘটে যাওয়া ট্রমাটিক ঘটনা কখনও বাস্তব স্মৃতি হয়ে, কখনও কল্পনা বা দুঃস্বপ্নের মধ্যে চলে আসে। ব্যক্তি বারবার সেই স্মৃতিতে আতঙ্কিত বোধ করেন। মনে করেন, তাঁর জীবনে আবারও সেই ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। মানসিক ট্রমা আক্রান্ত ব্যক্তির পিটিএসডি না দেখা দিলেও উপরোল্লিখিত কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এটি নির্ভর করে ব্যক্তি কী ধরনের ট্রমা অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, কতখানি সময় সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেছেন এবং তাঁর আগের মানসিক অবস্থার ওপর। তবে উপরোল্লিখিত লক্ষণগুলোর কিছু যদি দেখা যায়, তবে অবশ্যই ব্যক্তির জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন হবে। মনে রাখতে হবে, ট্রমা অভিজ্ঞতা সব বয়সের মানুষের, এমনকি সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষকেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।’ এই সাইকোলজিস্টের মতে, এভাবে গড়ে ওঠা মানসিক ট্রমা ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে, আবার সমাজেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সমাধান তাই বহুমাত্রিক হতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যকে আর বিলাসিতা হিসেবে দেখা যাবে না, এটি মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হতে হবে। শিশুদের জন্য স্কুল পর্যায়ে কাউন্সেলর নিয়োগ, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবারে বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে খোলা মনে শোনা, তাদের আবেগকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ব্যর্থতাকে সহজভাবে মেনে নিতে শেখানো। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা প্রচারণা চালানো অপরিহার্য।

আরও পড়ুন

×