ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দরকার সুদৃঢ় ইকোসিস্টেম

আঁচল ফাউন্ডেশনের সেমিনারে বক্তারা

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দরকার সুদৃঢ় ইকোসিস্টেম
×

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর, এমপি

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬ | ১৭:১৯ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১৩:৩৯

তারুণ্য মানেই অফুরন্ত প্রাণশক্তি, বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। কিন্তু বর্তমানের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে এই তরুণ প্রজন্মই যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে হতাশার চোরাবালিতে। আধুনিক জীবনের নানাবিধ চাপ, একাকীত্ব, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তৈরি করা কৃত্রিম প্রত্যাশার ফাঁদে পড়ে তুচ্ছ ঘটনা বা সামান্য অপ্রাপ্তিতেই অনেকে বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের মতো ভয়ংকর পথ। দেশের ক্রমবর্ধমান এই আত্মহত্যার প্রবণতা রুখতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। আর এই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সোচ্চার সংগঠন ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’।

সংগঠনটির দীর্ঘ আট বছরের নিরলস পথচলার পরিক্রমায় ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন করা হয় এক সময়োপযোগী সেমিনার। আজ ২ মে (শনিবার) রাজধানীর বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— জেন জি, আলফা এবং বিটা প্রজন্মের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের ইকোসিস্টেম বিনির্মাণ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর, এমপি বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা অনেক সময় ছোটখাটো অপ্রাপ্তি থেকেই চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। অথচ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা আত্মনিয়ন্ত্রণই পারে এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তি দিতে।’

নিজের জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তরুণদের উদ্দেশে তিনি আশার বাণী শোনান। তাঁর মতে, হতাশায় নিমজ্জিত না হয়ে নিজের যতটুকু সক্ষমতা আছে, তা দিয়েই শুরু করা উচিত। সামান্য চেষ্টা আর একটি ছোট উদ্যোগই জীবনকে এক সুন্দর ও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি আঁচল ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে আখ্যায়িত করেন।

সেমিনারে উপস্থিত দর্শকদের একাংশ

প্রয়োজন সঠিক মেন্টর ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রজন্মের মানসিক চাপ মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের ওপর জোর দেন সেমিনারের বিশেষ অতিথি ডা. আতিকুর রহমান মুজাহিদ, এমপি। তিনি জানান, জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ও মানসিক প্রশান্তির জন্য একজন সঠিক মেন্টর বা ভালো বন্ধুর উপস্থিতি কতটা জরুরি। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনসিডিসি) প্রতিনিধি ডা. এস এম মুস্তাফিজ একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘‘যেহেতু মানসিক স্বাস্থ্য একটি বৃহত্তর সামাজিক ইস্যু, তাই এটি মোকাবিলায় ‘হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ বা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। ২৫ বছর বয়সের মধ্যেই যদি যুবসমাজের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো শনাক্ত করা যায়, তবে ভবিষ্যতে প্রায় ৭৫ শতাংশ জটিল মানসিক সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।’’

সেমিনারটি সভাপতিত্ব করেন আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ

পারিবারিক প্রভাব ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাজিদা ফাউন্ডেশনের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রুমা খন্দকার। বর্তমান প্রজন্মের মানসিক সংকটের পেছনের সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাবগুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বিশ্লেষণ করে তিনি একটি কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বহুমাত্রিক উদ্যোগের ওপর আলোকপাত করেন।

ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সায়েদুল ইসলাম সাঈদ এবং ডা. ফয়সাল রাহাত তরুণদের মানসিক সমস্যার কারণ, লক্ষণ এবং তা প্রতিরোধের বিজ্ঞানসম্মত দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষাব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন তাঁরা।

তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে জীবনের রূঢ় বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন টিবিআর-এর চেয়ারম্যান জান্নাতুল নওরিন উর্মি। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও তা থেকে উত্তরণের গল্প শুনিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন মানসিকভাবে সুস্থ ও শক্তসমর্থ মা-ই পারেন সমাজকে একটি সুস্থ সন্তান উপহার দিতে।’

আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজের সভাপতিত্বে এবং চিফ মেন্টর মো. সোহেল মামুনের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পরিচালিত এই আয়োজনটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন ছিল না; এটি ছিল ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। অনুষ্ঠানে সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, সমাজ এই ইস্যুতে ক্রমশ সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।

আট বছরের দীর্ঘ পথচলায় আঁচল ফাউন্ডেশন দেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতে যে অবদান রেখে চলেছে, তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। জেন জি, আলফা এবং বিটা প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ও টেকসই মেন্টাল হেলথ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার যে শপথ এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে অচিরেই হয়তো হতাশার আঁধার কেটে গিয়ে তরুণদের জীবনে বইবে নতুন ভোরের আলো।

আরও পড়ুন

×