ডে কেয়ারে এক টুকরো স্বস্তি
ডে কেয়ার যদি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের সঙ্গে চাকরিপ্রত্যাশী ও শিক্ষার্থী মায়েদের পড়ার সুযোগ করে দেয় তা অভিভাবকদের জন্য বড় পাওয়া
আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১৪:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বেলা ১১টা। ঢাকার ব্যস্ত এলাকা গ্রিন রোডের একটি বহুতল ভবনের নবম তলা। দরজার বাইরে সারি সারি সাজানো ছোট-বড় কয়েক জোড়া জুতা। ভেতরে পা রাখতেই কানে ভেসে আসে শিশুর উচ্ছল হাসির শব্দ। কেউ নিবিষ্ট মনে রং পেন্সিল দিয়ে আঁকিবুঁকিতে ব্যস্ত, কেউ ব্লক জোড়া দিয়ে বানাচ্ছে স্বপ্নের বাড়ি, কেউবা আবার কেয়ারগিভারের হাত ধরে দুলতে দুলতে শিখছে নতুন কোনো ছড়া। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো–এই পুরো আয়োজনে কোথাও কোনো ডিজিটাল পর্দার উপস্থিতি নেই। নেই কোনো মোবাইল ফোনের নীল আলো কিংবা টেলিভিশনের যান্ত্রিক শব্দ। যান্ত্রিক শহরের বুকে এ যেন এক অকৃত্রিম শৈশবের ক্যানভাস।
একই ছাদের নিচে, শিশুদের এই কোলাহল থেকে কয়েক কদমের ব্যবধানে পাশের আরেকটি কক্ষ। সেখানে পিনপতন নীরবতা। বসে আছেন কয়েকজন তরুণী ও মাঝবয়সী নারী। কারও টেবিলে বিসিএস পরীক্ষার বিশাল সিলেবাসের বই, কারও সামনে চিকিৎসাশাস্ত্রের জটিল নোট, কেউবা ল্যাপটপে মগ্ন হয়ে করছেন ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ। মাঝখানে কেবল একটা কাচের দেয়াল বা কয়েক ফুটের দূরত্ব। এক পাশে পরম নিরাপত্তায় বেড়ে উঠছে সন্তান আর অন্য পাশে নিজের ভবিষ্যৎ বুনছেন মা। মাঝখানের এই অদৃশ্য সেতুটির নামই যেন ‘কেয়ারিং হ্যান্ডস ডে কেয়ার’।
কর্মজীবী কিংবা উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত মা-বাবাদের জন্য সন্তানকে নিরাপদে রেখে নিজের ক্যারিয়ার বা পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়াটা এখন রীতিমতো এক দুঃসাধ্য সংগ্রাম। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবারেই শিশুকে তুলে দেওয়া হয় গৃহকর্মীদের হাতে। গৃহকর্মীদের কাছে শিশু ভোলানোর সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার হলো মোবাইল ফোন বা টেলিভিশন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর স্ক্রিন-টাইম শূন্য বা একদম সীমিত রাখার ওপর জোর দিচ্ছে, তখন ঢাকার ঘরে ঘরে শিশুরা শিকার হচ্ছে ‘ডিজিটাল আসক্তি’র। এ বাস্তব সংকটটিকেই সমাধানের চেষ্টা করছে ‘কেয়ারিং হ্যান্ডস ডে কেয়ার’। উদ্যোক্তাদের ভাষায়, এটি শুধু শিশুকে আটকে রাখার জায়গা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ, যেখানে শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ এবং অভিভাবকের স্বপ্ন–দুটোকেই সমান সম্মান জানানো হয়।
চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থী মা মুমতা হেনা। তাঁর স্বামী সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের একজন চিকিৎসক। তাদের ছোট সন্তান আয়াশ এখন নিয়মিত সময় কাটায় এই ডে কেয়ারে। মুমতা হেনা বলেন, ‘বাসায় যখন হেল্পিং হ্যান্ডের কাছে আয়াশ থাকত, তখন তাকে শান্ত রাখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেওয়া হতো। ওর স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ নিয়ে আমরা প্রচণ্ড উৎকণ্ঠায় ছিলাম। এখানে আসার পর পুরো দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখানে সিসি ক্যামেরার অ্যাকসেস থাকায় যখন খুশি নিজের বাচ্চাকে দেখতে পারি। সবচেয়ে প্রশান্তির জায়গা হলো, বাচ্চারা এখানে কোনো স্ক্রিন ছাড়া সম্পূর্ণ ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটিতে ব্যস্ত থাকে। বাচ্চার এই নিরাপদ অবস্থানের পাশাপাশি এখানে আমি নিশ্চিন্তে নিজেদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছি, বাসায় থাকলে যা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।’
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর জীবনের প্রথম পাঁচ বছর তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়েই মানুষের মস্তিষ্কের প্রায় ৯০ শতাংশ গঠিত হয়। কেয়ারিং হ্যান্ডসের কার্যক্রম সাজানো হয়েছে আধুনিক চাইল্ড-সাইকোলজির এ সূত্র মেনেই। প্রতিষ্ঠানটির অপারেশন ম্যানেজার পারভীন আক্তার জানান, ‘আমরা শিশুর বয়স ও তাদের বিকাশগত প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে তিনটি আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করি–ইনফ্যান্ট (নবজাতক), টডলার (হাঁটতে শেখা শিশু) এবং স্কুলার। প্রতিটি শ্রেণির জন্য আমাদের রয়েছে আলাদা সিলেবাস, শিখন পদ্ধতি এবং রুটিন।’ তিনি আরও জানান, শিশুর সর্বোচ্চ যত্ন নিশ্চিত করতে এখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত নারী পরিচর্যাকারী ও শিক্ষাকর্মী রয়েছেন। ফলে প্রতিটি শিশু তার একান্ত ব্যক্তিগত মনোযোগটুকু পায়।
প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে অভিনব দিকটি হলো এর ‘রিডিং জোন’। শিশুর অভিভাবক তো বটেই, বাইরের যে কোনো নারীও প্রতিমাসে দেড় হাজার টাকার বিনিময়ে এই শান্ত পরিবেশটি ব্যবহার করতে পারেন। বর্তমানে এই রিডিং জোনটি হয়ে উঠেছে পেশাজীবী ও চাকরিপ্রত্যাশী নারীর জন্য এক দারুণ কো-ওয়ার্কিং স্পেস। মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের মধ্যে এমন আন্তর্জাতিক মানের সেবা পৌঁছে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
- বিষয় :
- আশরাফুল ইসলাম আকাশ
- ডে কেয়ার সেন্টার