যে ক্ষত শৈশব পেরিয়েও শুকায় না
কামাল চৌধুরী, অধ্যাপক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাবি
কামাল চৌধুরী
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু যৌন নির্যাতনের খবর এখন প্রায়ই সামনে আসছে। কখনও সহপাঠী, কখনও উঁচু ক্লাসের শিক্ষার্থী, আবার অনেক সময় শিক্ষক নিজেই নির্যাতক। ঘটনা কমছে না, বাড়ছে। এটা উদ্বেগের। সমাজ হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জারও। যে স্কুল শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানে সে আজ সবচেয়ে অরক্ষিত। ভরসার মানুষের হাতে শিশু নির্যাতিত হলে সেটা আর একজন মানুষের অপরাধে আটকে থাকে না। তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর সামাজিক কাঠামোর ব্যর্থতাও খোলাখুলি ধরা পড়ে।
যে কোনো যৌন নির্যাতনই শিশুর মনে গভীর দাগ রেখে যায়। তবে দাগ কতটা গভীর হবে, তা অনেকটা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর: নির্যাতক কে, নির্যাতন কতদিন ধরে চলেছে আর তা কতটা ভয়াবহ ছিল। ছেলে ও মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে প্রভাবের ধরনও আলাদা হতে পারে।
সবচেয়ে বড় আঘাতটা লাগে বিশ্বাসে। যার রক্ষা করার কথা, সে-ই যখন ক্ষতি করে, শিশুর ভেতরের নিরাপত্তার জগৎ ভেঙে পড়ে। সে বুঝে উঠতে পারে না, যাকে বিশ্বাস করত সে কেন এমন করল। অনেক সময় দোষটা নিজের ঘাড়েই তুলে নেয়। ভাবে, হয়তো আমারই ভুল ছিল। এই আত্মদোষারোপ তার আত্মমর্যাদা একটু একটু করে ক্ষয়ে দেয়। সে নিজেকে নষ্ট আর মূল্যহীন ভাবতে শেখে। একসময় বিষণ্নতা চেপে বসে।
ক্ষতটা নানা পথে বেরিয়ে আসে। দুঃস্বপ্ন আর দুঃসহ স্মৃতি শিশুটিকে তাড়া করে বেড়ায়। চেনা কোনো শব্দ, জায়গা বা মুখের আদল হঠাৎ তীব্র আতঙ্ক জাগিয়ে তোলে। এগুলো পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের (পিটিএসডি) লক্ষণ। বারবার নির্যাতনের শিকার শিশু যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে বাস্তব থেকে মনকে সরিয়ে নেয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলে ডিসোসিয়েশন। ছোট শিশুরা ফিরে যায় আগের বয়সের আচরণে। বিছানা ভেজায়, আঙুল চোষে, অল্পতেই ভয় পায়, কথা বলা কমিয়ে দেয়। সহপাঠীদের সঙ্গে মিশতে চায় না। খেলার মাঠ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
বয়স বাড়লেও এই ক্ষত মিলিয়ে যায় না। বড় হয়ে অনেকের মেজাজে চরম ওঠানামা দেখা দেয়, আবেগ সামলাতে কষ্ট হয়, ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে। মানুষকে বিশ্বাস করতে না পারায় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ অতিনির্ভরশীল হয়ে ওঠে, কেউ ঘনিষ্ঠতা থেকে দূরে সরে যায়। দাম্পত্য ও যৌনজীবনে ভীতি কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার মানুষটি পরে নিজে অন্যের প্রতি নির্যাতকের আচরণ করার ঝুঁকিতে পড়ে।
তাই শৈশবের যৌন নির্যাতন সাময়িক কোনো আঘাত নয়। এটি একটি পুরো জীবনের ওপর লম্বা ছায়া ফেলে। তবে সেই ছায়া চিরস্থায়ী নয়। সময়মতো কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি, পরিবারের অবিচল পাশে থাকা আর নিরাপদ পরিবেশ পেলে শিশু ধীরে ধীরে সেরে ওঠে। সেই নিরাপদ পরিবেশ গড়ার প্রথম দায় স্কুলের। তারপর দায়টা আমাদের সবার।
- বিষয় :
- শৈশব