স্বর্ণের দর লাগামহীন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
অলংকার ছাড়া নারী, ফুল ছাড়া বাগানের মতো– এটা প্রচলিত প্রবাদ। আর অলংকারের কথা উঠলে স্বর্ণ সবার পছন্দের শীর্ষে থাকে। স্বর্ণ কেবল নারীর সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ নয়, হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বব্যাপী এটা পারিবারিক সম্মান ও সামাজিক অবস্থানের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা হিসেবেও বিবেচিত হয়।
গ্রাম-বাংলায় তো প্রচলিতই আছে– ‘নারীর গহনা তার ব্যাংক, তার বিপদের দিনের সঞ্চয়’। তবে গত কয়েক বছর ধরে হু হু করে বাড়তে থাকা স্বর্ণের দরের কারণে তা ক্রমেই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। স্বর্ণ এখন নারীর শোভা বাড়ানো থেকে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের আকার আর বড় বিনিয়োগকারীর মুনাফা বাড়াচ্ছে বেশি।
স্বর্ণের দাম কেন এত বাড়ছে
গত চার বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম দ্রুত বেড়েছে। একসময় স্বর্ণকে শুধু নিরাপদ সঞ্চয় হিসেবে দেখা হলেও, এখন এটি বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। করোনা অতিমারির পর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ বাজারে ছাড়ে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় এবং টাকার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ কিনতে শুরু করে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে সেই চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা, চীনের অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত স্বর্ণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারী নয়, অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও রিজার্ভে স্বর্ণ বাড়াতে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সুদহার ও সরকারি বন্ডের সুদহার কমানোর ফলে ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা স্বর্ণের দামকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এক কথায়, বিশ্ব যত অস্থির হচ্ছে, মানুষ তত বেশি স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে– আর সেটাই গত চার বছরে স্বর্ণের দাম বাড়ার মূল কারণ।
আন্তর্জাতিক বাজারে দর বাড়ল কতটা
আন্তর্জাতিক বাজারে গত দুই বছরে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম নেমে এসেছিল আউন্সপ্রতি প্রায় এক হাজার ৭০০ ডলারে। যা তৎকালীন বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৬৩ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের বাজার প্রায় স্থিতিশীল ছিল। সর্বোচ্চ দর উঠেছিল আউন্সপ্রতি প্রায় দুই হাজার ডলারে।
২০২৪ সালের শুরু থেকে চড়তে থাকে স্বর্ণের দর। বছর শেষে গড় দাম পৌঁছায় আউন্সপ্রতি প্রায় দুই হাজার ৭০০ ডলারে বা ভরি প্রতি প্রায় এক লাখ ২৩ হাজার টাকা। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দর কার্যত রকেট গতি পায়। গত ২৯ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ৬০০ ডলার ছাড়ায়। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমে আউন্সপ্রতি প্রায় তিন হাজার ৯০০ ডলারে নেমেছে, যা ভরি প্রতি প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার টাকার সমান।
দেশের বাজারে দর বৃদ্ধি
আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে মিলিয়ে দেশের বাজারে স্বর্ণের দর নির্ধারণ করার কথা বাজুস বললেও বাস্তবে আন্তর্জাতিক দরের তুলনায় দেশের বাজারের তুলনায় স্বর্ণের দর বেড়েছে বেশি। যেমন– গতকালের দর অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণের দর দুই লাখ ২৪ হাজার টাকা হলেও দেশে বিক্রি হয় দুই লাখ ৫৪ হাজার ৪৫০ টাকায়।
২০১৮ সালেও দেশে ৫০ হাজার টাকায় মিলত এক ভরি স্বর্ণ। গত ২৯ জানুয়ারি দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকা ছাড়িয়েছিল, যা ভ্যাটসহ ছুঁয়েছিল তিন লাখ টাকা।
স্বর্ণ যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে
বিভিন্ন দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণ বাড়চ্ছে। কারণ, স্বর্ণের চাহিদা সব সময় থাকে। এখন প্রতিবছর আন্তর্জাতিক স্বর্ণের বাজার পাঁচ হাজার টন ছাড়িয়েছে। কিন্তু চাহিদা আরও বেশি। এর সিংহভাগ বিনিয়োগের জন্য। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, অদ্যাবধি বিশ্বের নানা খনি থেকে মোট উত্তোলিত স্বর্ণের পরিমাণ এক লাখ ৯০ হাজার ৪০ টন। এর প্রায় ৪০ হাজার টন বা মোটের প্রায় ২১ শতাংশ আছে বিভিন্ন দেশের রিজার্ভে। যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভে আছে সবচেয়ে বেশি আট হাজার ১৩৩ টন। জার্মানির রিজার্ভে তিন হাজার ৩৫০ টন, ইতালির দুই হাজার ৪৫২ টন, ফ্রান্সের দুই হাজার ৪৩৭ টন, রাশিয়ার দুই হাজার ৩৩৩ টন, চীনের দুই হাজার ২৯৯ টন, সুইজারল্যান্ডের এক হাজার ৪০ টন। এর বাইরে আইএমএফের ফান্ডেও আছে দুই হাজার ৮১৪ টন স্বর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভেও স্বর্ণ আছে। এর পরিমাণ সোয়া ১৪ টনের বেশি, যা বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৭ শতাংশ।
দর বৃদ্ধির কী প্রভাব– কোথায়, কতটা
বাঙালি পরিবার– হোক যে জাতের বা ধর্মের, হোক দরিদ্র কিংবা ধনী– স্বর্ণালংকার ছাড়া বিয়ের কথা কেউ ভাবেন না। তবে স্বর্ণের দরের বাড়বাড়ন্ত এতটাই, নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্ত পরিবারকেও ভাবতে হচ্ছে বিয়েতে কতটা স্বর্ণ কিনবে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটের আমিন জুয়েলার্সে কথা হয় রাজধানীর মাদারটেক থেকে আসা মধ্যবয়সী রেহাল উদ্দিন দম্পতির সঙ্গে। জানালেন, ইলেকট্রনিক পণ্যের মেকানিকের কাজ করেন তিনি। ছেলের বিয়েতে পুত্রবধূর জন্য অলংকার কিনতে এসেছেন। কিন্তু স্বর্ণের দর এতই বেশি, কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছেন না।
প্রায় একই অবস্থা শান্তিনগর থেকে আসা নুসরাত আলমের। ব্যবসায়ী পরিবারে ছোট ভাইয়ের বিয়ের জন্য অলংকার কিনতে গলার হার যেটাই পছন্দ করছেন, তা বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমিন জুয়েলার্সের ম্যানেজার গোকুল জানান, বিয়ের জন্য যে পরিবার আগে পাঁচ ভরি স্বর্ণ কেনার চিন্তা করত, এখন তারা এক ভরি স্বর্ণও কিনছেন না। কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও শোরুম ভাড়া দিয়ে ব্যবসা ধরে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন দর বাড়িয়ে চলেছে বাজুস
জুয়েলারি ব্যবসায়ী মালিকদের সংগঠন বাজুসের সভাপতি এনামুল হক খান জানান, সব পণ্যের মতো ক্রেতা-বিক্রেতার স্বার্থে স্বর্ণেরও একটা গ্রহণযোগ্য দর নির্ধারণ ব্যবস্থা থাকা উচিত। এ কাজটি বাজুস করছে। আন্তর্জাতিক বাজারদরকে বিবেচনায় নিয়ে দেশে স্বর্ণের দর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু দেশে বৈধভাবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে স্বর্ণ আমদানি হয় না। এর ব্যাখ্যায় বাজুস সভাপতি বলেন, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে স্বর্ণ আমদানিতে করতে শুল্ক-কর বাবদ খরচ আছে ৩০ শতাংশ। এত কর দিয়ে এ ব্যবসা করা সম্ভব না। দেশে স্বর্ণ আসে ব্যাগেজ রুলসের আওতায়। এ স্বর্ণও আন্তর্জাতিক দরে কেনা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না করলে পাচার হওয়ার ভয় থেকেও নিয়মিত দর নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় বাংলাদেশে স্বর্ণের দর অনেক বেশি। এর কারণ ব্যাখ্যায় বাজুস নেতারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারদর হলো ‘সলিড গোল্ড’-এর। ১২ শতাংশ অলংকার তৈরির মজুরি ধরে দর নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রতিবেশী ভারত বা পাকিস্তানের বাজারের তুলনায় বেশি দাম হওয়ার উপযুক্ত ব্যাখ্যা মিলল না জুলেয়ারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।
- বিষয় :
- স্বর্ণ
