ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিমত

বস্ত্র ও পোশাক খাতে যেসব বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি

বস্ত্র ও পোশাক খাতে যেসব বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি
×

মো. মহিউদ্দিন রুবেল

মো. মহিউদ্দিন রুবেল

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাত শুধু রপ্তানি আয়ের মূল উৎস নয়, গ্রাম থেকে শহরে সারাদেশের কোটি মানুষের জীবিকার ভরসা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত শ্রমিক, উদ্যোক্তা, সরবরাহ শৃঙ্খলার অংশীদার– সব মিলিয়ে এটি আমাদের অর্থনীতির প্রকৃত মেরুদণ্ড। তাই নতুন সরকারের প্রতি এ খাতের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বড়। আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়; চাই নিশ্চয়তা, অংশীদারিত্ব ও একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি।

স্থিতিশীল রপ্তানি ও করনীতি, উন্নত অবকাঠামো, শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতি, কমপ্লায়েন্স ও সবুজ প্রবৃদ্ধিতে বাস্তব সহায়তা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও সুশাসন, পশ্চাৎমুখী সংযোগ ও মূল্য সংযোজন, ডলার, ঋণপত্র ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের ব্যবস্থা– সব মিলিয়ে এ শিল্প এখন ভলিউম থেকে ভ্যালুতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়িক নেতা, শ্রমিক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ গড়ে উঠতে পারলে তৈরি পোশাক খাত আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবেই থাকবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও শক্তিশালী সাফল্যের গল্প তৈরি করবে।

নীতির স্থিতিশীলতা: প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন
দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়াদেশ ও অতি অল্প মুনাফার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই শিল্পের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতাই প্রথম প্রয়োজন। হঠাৎ ট্যাক্স, ভ্যাট, উৎসে কর বা নগদ প্রণোদনা বদলে গেলে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল অনিশ্চয়তায় পড়ে, ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বিঘ্নিত হয় এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রেতারা যখন ১২-১৮ মাস আগেই পরিকল্পনা করে তখন নীতির অনিশ্চয়তা শুধু দামের সমীকরণই নয়, দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা– রপ্তানি, কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বঘোষিত নীতি, গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও সংযোগ শিল্পের জন্য পরিষ্কার  পথনকশা এবং ঘন ঘন পরিপত্র বদল না করে নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রয়োগে স্বচ্ছতা।

অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থা
পরিবহন ব্যয়, বন্দরজট, সড়কে যানজট এবং সীমিত রেল ও নৌপরিবহন,  ‘লুকানো ব্যয়’ আমাদের প্রতি ডলারের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমায়। বিশ্ববাজারে এখন শুধু দাম নয়, সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো এখন সরাসরি আমাদের সরবরাহকাল ও নির্ভরযোগ্যতার নির্ধারক। আশা রাখি নতুন সরকার আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল কাস্টমস, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ প্রধান করিডরে মসৃণ ও নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ, রেল ও নৌপথভিত্তিক বহুমাত্রিক পরিবহন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহে নির্ভরযোগ্যতা ও যুক্তিসংগত শুল্কের ওপরে জোর নজর দেবে। 

বাণিজ্য কূটনীতি ও বাজার বহুমুখীকরণ
এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসা অবশ্যম্ভাবী। এর ফলে শুল্ক সুবিধা কমে যাবে– এটা মাথায় রেখে বাণিজ্য কূটনীতিকে অর্থনৈতিক মূল নীতি হিসেবে নিতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বড় বাজারে স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে সক্রিয় কূটনীতি জরুরি। পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও উদীয়মান এশীয় অর্থনীতিতে লক্ষ্যভিত্তিক নতুন বাজার খোঁজা দরকার। এফটিএ ও পিটিএতে ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষক ও নীতিনির্ধারকের সমন্বয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ব্যবসার পরিবেশ, সুশাসন ও পশ্চাৎমুখী সংযোগ
লাইসেন্স, নবায়ন ও ইউটিলিটি কানেকশন দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ করতে ওয়ান স্টপ অনলাইন সার্ভিস দরকার, যেখানে সব ফি, কাগজপত্র ও সময়সীমা স্পষ্ট থাকবে। দুর্নীতি ও লুকানো খরচ কমাতে ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-ফাইলিং ও জবাবদিহিমূলক অভিযোগ নিষ্পত্তি জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বর্তমান শিল্প মালিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতা বাড়াতে টেক্সটাইল, স্পিনিং, সহায়ক সামগ্রী, কেমিক্যাল, প্যাকেজিংসহ পশ্চাৎমুখী সংযোগে প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে স্থানীয় কাঁচামাল বাড়ে, সরবরাহকাল কমে ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের, মূল্য সংযোজিত ও বহুমুখী পণ্য উন্নয়নে গবেষণা ও উন্নয়ন, নকশা, দক্ষতা উন্নয়ন ও বাজার বৈচিত্র্যকরণে সহায়তা প্রয়োজন।

দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তি
শুধু কম মজুরির শ্রম দিয়ে আর টিকে থাকা যাবে না। লাগবে দক্ষ জনশক্তি, স্বয়ংক্রিয়করণ ও ডিজিটাল সক্ষমতা। টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, পলিটেকনিক, ফ্যাশন ও টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের পাঠ্যক্রমকে শিল্পের চাহিদামাফিক করতে হবে। আপস্কিলিং-রিস্কিলিং, মধ্যপর্যায়ের ব্যবস্থাপক ও সুপারভাইজারদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং যৌথ তহবিলের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধাক্কা কমানো সম্ভব।

কমপ্লায়েন্স ও টেকসই উন্নয়ন
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবুজতম গার্মেন্টস কারখানার অন্যতম কেন্দ্র। এই অবস্থান ধরে রাখতে সবুজ বিনিয়োগে স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, কর প্রণোদনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সহায়ক নীতি ও ইএসজি মানদণ্ডে কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন। অগ্নি, ভবন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে বৈশ্বিক চাপের জবাব নয়; জাতীয় অগ্রাধিকার করতে হবে। এতে ক্রেতাদের আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুটোই বাড়বে।

ডলার, অর্থায়ন ও অংশীদারিত্বের নতুন সংস্কৃতি
ডলার সংকটের মধ্যেও কাঁচামাল ও মেশিনারি আমদানির ঋণপত্র সচল রাখতে রপ্তানি আয়ের ডলারের একটি অংশকে এই খাতে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ঋণপত্র নীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হবে। প্রযুক্তি উন্নয়ন, স্বয়ংক্রিয়করণ, সবুজ কারখানা ও সরবরাহকারী শিল্পে বিনিয়োগে স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও সবুজ অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি।
সব শেষে আমাদের মূল চাওয়া, নীতিনির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ নয়, অংশীদারিত্বের সংস্কৃতি। বড় সিদ্ধান্তের আগে শিল্প মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশীদার ও গবেষকদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ দরকার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ইতোমধ্যেই এক সফল অর্থনৈতিক গল্প। এখন সময় দ্বিতীয় অধ্যায় লেখার, যেখানে আমরা পরিমাণ থেকে মূল্যে, সস্তা শ্রম থেকে দক্ষ মানবসম্পদে এবং স্বল্পমেয়াদি সুবিধা থেকে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের পথে এগোব। এই যৌথ যাত্রায় নতুন সরকারের সঙ্গে আমরা থাকতে চাই প্রকৃত অংশীদার হিসেবে।
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেনিম এক্সপার্ট

আরও পড়ুন

×