আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস
আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার: খাদ্য নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের পথ
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:২২ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:২৫
প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিনটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, অধিকার ও সংগ্রামের গল্পগুলো সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য ‘আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার: খাদ্য নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের পথ’– এই উপলক্ষকে আরও গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক অর্থবোধে প্রসারিত করেছে।
‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মাথায় শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু আদিবাসীদের জন্য এই শব্দের অর্থ বহুমাত্রিক– নিজের জীবনধারা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার। এটি শুধুই অধিকার নয়; বরং অস্তিত্বের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তরবঙ্গ, হাওর অঞ্চল বা সিলেট বিভাগের মতো এলাকায় বসবাসরত সাঁওতাল, মারমা, চাকমা, হাজং, গারো, মণিপুরি, খাসিয়া, বমসহ বহু জাতিসত্তার মানুষ প্রথাগত কৃষি, বনজ সম্পদ এবং পরিবেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রক্ষা করে জীবনযাপন করে আসছে। কিন্তু আধুনিক উন্নয়ন, ভূমি দখল, পর্যটন ও শিল্পায়নের নামে সেই জীবনধারা হুমকির মুখে পড়েছে।
একইভাবে খাদ্য নিরাপত্তার অর্থ শুধু পেট ভরে খাওয়া নয়– এটি পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যকর ও সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য খাদ্যের সহজলভ্যতাকে বোঝায়। আদিবাসীদের খাদ্যচর্চা মূলধারার বাজারনির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে প্রায়ই অমিল।
জুম চাষ, বনজ খাদ্য, শাকপাতা, মাশরুম, বাঁশের কোড়ল– এসব তাদের খাদ্য তালিকার অংশমাত্র নয়; বরং তাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য ধারা। কিন্তু বন উজাড়, খনিশিল্প বা জমি অধিগ্রহণের কারণে এসব উৎস দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক আদিবাসী পরিবার এখন জুম চাষ করতে পারছে না; ফলে স্থানীয় খাদ্যচর্চা থেকে সরে এসে বাজারের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে, যেখানে সহজলভ্য খাদ্য মানে কম পুষ্টির প্রক্রিয়াজাত পণ্য। সাঁওতাল পল্লিগুলোতেও চুক্তিভিত্তিক কৃষি ও জমির সংকটে একই চিত্র দেখা যায়।
খাদ্য সার্বভৌমত্ব
খাদ্যের উৎস, উৎপাদন পদ্ধতি, কী খাব– এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি কোনো জনগোষ্ঠী নিজেরাই দিতে না পারে, তবে তা ‘সার্বভৌমত্ব’হীন এক অবস্থা। আদিবাসীরা আজ সেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
বিদেশি কোম্পানি ও ব্যবসার স্বার্থে কৃষি জমিতে বাণিজ্যিক ফল বা কাঠ গাছ লাগানো হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে প্রথাগত ফলদ গাছ, হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় বীজ ও স্বাদের বৈচিত্র্য। যেমন– গারো পাহাড়ে বিদেশি ফলের চাষ বাড়ায় দেশি জাতের ফলগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। পাহাড়ে তামাক চাষ তেমনই একটি ধ্বংসযজ্ঞ। খাদ্য সার্বভৌমত্ব আদিবাসীদের শুধু ক্ষুধামুক্তই করে না; বরং তাদের সংস্কৃতি, পরিচিতি ও পরিবেশগত ভারসাম্যও রক্ষা করে। এটি মানবাধিকার নয় শুধু; বরং টিকে থাকার ভিত্তি।
আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথে রয়েছে নানা বাধা– ভূমি অধিকারের অনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্নয়নের নামে শোষণ।
এশিয়াজুড়ে একটি বড় হুমকি হয়ে উঠেছে ভূমি দখল। খনি, পর্যটন, অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কৃষির মতো প্রকল্পগুলো শুধু জমি কেড়ে নিচ্ছে না; বরং মাটি, জলাশয়, বন ও বন্যপ্রাণীর বাসস্থান ধ্বংস করছে– যা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বন সংরক্ষণের নামে অনেক বনে আদিবাসীদের ঢুকতেও দিচ্ছে না। আর ভূমির অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে আদিবাসীরা প্রায়ই সহিংসতা, আইনি হয়রানি, রাষ্ট্রবিরোধী তকমা ও হুমকির মুখে পড়ে।
তবে আশার কথা হলো, দেশে দেশে নাগরিক পরিসর যখন সংকুচিত হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় নজরদারি যখন বাড়ছে, তখনও আদিবাসীরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে– নিজেদের ভূমি, প্রকৃতি ও সংস্কৃতি রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাওয়ায় স্বনির্ভর খাদ্যচর্চা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তবে এ সংকটেও আদিবাসীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও যত্নের সংস্কৃতি তাদের টিকে থাকার শক্তি জোগায়।
কভিড মহামারির সময় শহর ছেড়ে অনেক তরুণ গ্রামে ফিরে যান। থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে এই ‘ঘরে ফেরা’ তরুণরা স্থানীয় কৃষি ও আদিবাসী জ্ঞানচর্চায় সক্রিয় হয়। এখন চলছে সেই জ্ঞানকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।
নেপালে আইএফএডির সহায়তায় পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে আদিবাসী খাবারের পুষ্টিগুণ ও ঐতিহ্যবাহী রান্না পদ্ধতির গুরুত্ব। তবে এই মূল্যবান তথ্য এখনও অনেকটাই অগোচরে– সরকার, সাধারণ মানুষ এমনকি আদিবাসী সমাজের অনেকের কাছেও এসব তথ্য পৌঁছায় না। এই খাদ্য ব্যবস্থার বৈচিত্র্য, পুষ্টিমান ও টেকসই দিকগুলো নথিভুক্ত করা ও স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা মানে যেমন তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়; তেমনি এটি শুধু তাদের ‘সহানুভূতির’ চোখে দেখা নয়। বরং তাদের প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। এই অধিকার চর্চার পথেই আসতে পারে খাদ্য নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব– যার মধ্য দিয়ে টিকে থাকে মানুষ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতি।
