বাংলাদেশ প্রেস ফটো প্রদর্শনী ২০২৬
প্রতিরোধ ও মানবিকতার দিনপঞ্জি
নিম্ন আয়ের একটি বসতিতে ভয়াবহ আগুন লাগার পরের দিন ভোরে পুড়ে যাওয়া বাড়ির মেঝেতে ঘুমোতে দেখা যাচ্ছে ক্লান্ত শ্রান্ত পরিবারের সদস্যদের। কড়াইল, ঢাকা। ২৬ নভেম্বর ২০২৫ / ছবি:: মো. মাজহারুল ইসলাম
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০০ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ২২:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় শব্দ হয়ে আটকে থাকে না; কখনও কখনও তা মূর্ত হয়ে ওঠে ক্যামেরার ফ্রেমে, আলো-ছায়ার খেলায়। একটি স্থিরচিত্র কখনও হয়ে ওঠে শানিত প্রতিবাদ, কখনও বা হারিয়ে যাওয়া মানুষের শেষ স্মৃতিচিহ্ন। নাগরিক ব্যস্ততার ভিড়ে যে অসমতা, বঞ্চনা কিংবা মানবিকতার গল্পগুলো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, আলোকচিত্রীর লেন্স সেগুলোকে পরম মমতায় তুলে আনে জনসমক্ষে।
এমনই এক দৃশ্য-সংরক্ষণাগারের দেখা মিলল রাজধানীর পান্থপথের দৃকপাঠ ভবনে। ১২ আগস্ট শেষ হলো ১৩ দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ প্রেস ফটো প্রদর্শনী ২০২৬’। গত ৩১ জুলাই শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী যেন ২০২৫ সালের বাংলাদেশের এক প্রামাণ্য দলিল। আগুনে পোড়া জনপদ, পানিবন্দি নগরজীবন, মানুষের হাড়ভাঙা সংগ্রাম, উৎসব-পার্বণ থেকে শুরু করে ধর্মীয় সম্প্রীতি– বহুমাত্রিক এক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে দেশের প্রথম সারির আলোকচিত্র সাংবাদিকদের ক্যামেরায়।
আলোকচিত্র সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করতে ২০২১ সালে শুরু হওয়া এ আয়োজন এবার পঞ্চম বছরে পদার্পণ করল। এবারের আসরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত ২০২ জন আলোকচিত্র সাংবাদিক প্রায় এক হাজার ৬০০টি ছবি জমা দিয়েছিলেন। সেখান থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, প্রাণ-প্রকৃতি ও তথ্যচিত্র–এই ছয়টি বিভাগে বাছাইকৃত সেরা ৩২টি ছবি নিয়ে সাজানো হয় পুরো প্রদর্শনী।

প্রদর্শনীর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘পিকচার অব দ্য ইয়ার ২০২৫’ খেতাব জেতা ছবিটি। দৈনিক প্রথম আলোর ডেপুটি হেড অব ফটোগ্রাফি সাজিদ হোসেনের তোলা এ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দর্শকরা থমকে গেছেন বারবার। গত বছরের ১৪ অক্টোবর মিরপুরের শিয়ালবাড়ীতে একটি রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরের মুহূর্ত ধরা পড়েছে তাঁর লেন্সে। আগুনের লেলিহান শিখার ধ্বংসযজ্ঞ, নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মানুষের তীব্র উৎকণ্ঠা আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবনের নির্মম বাস্তবতা–সব মিলিয়ে ছবিটি যেন এক জীবন্ত ট্র্যাজেডি।
জনমুখী সাংবাদিকতা বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন দ্য ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিক মো. মাজহারুল ইসলামের তোলা ঢাকার কড়াইল বস্তি অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী জীবন সংগ্রামের একটি ছবি। চারদিকে পোড়া টিন আর ছাইয়ের স্তূপ, তারই মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছে একটি পরিবার! মানুষ কখন এমন ঘুমাতে পারে? যখন তার চারপাশ নিরাপদ থাকে, নাকি যখন তার আর হারানোর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না? অগ্নিকাণ্ডের পরদিন রাতভর নিজেদের সম্বল খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত মানুষের এই দৃশ্য নগরদরিদ্রের অনিশ্চিত জীবনের এক অমোঘ প্রতিচ্ছবি।

একই বিভাগে শাহরিয়ার আমিন ফাহিমের আরেকটি ছবিতে উঠে এসেছে সিলেটের কেওয়াছড়া চা-বাগানের শ্রমজীবী নারীদের বিষাদময় জীবন। ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া দাসসুলভ এই শ্রমব্যবস্থায় দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকার দাবিতে ২০২২ সালের দুর্বার আন্দোলন এবং দিনশেষে মাত্র ১৭০ টাকায় আপস করার করুণ ইতিহাস যেন ছবিতে থাকা দুই নারী শ্রমিকের শূন্য দৃষ্টিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমে অবিরাম পাতা তোলা আর ন্যূনতম সুরক্ষাহীনতার মাঝে এ মানুষগুলোর জীবন কেবলই বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। সবুজ চা-বাগানের মনোরম সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বৈষম্যের এক জ্বলন্ত দলিল এই ছবি।
অন্যদিকে, বিশেষ সম্মাননা পাওয়া দ্য ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের মাহমুদ জামানের ছবিতে দেখা যায় এক চরম মানবিক ও একই সঙ্গে মর্মান্তিক দৃশ্য–সড়ক অবরোধে আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্স থেকে এক মুমূর্ষু নবজাতককে মানুষের হাতে হাতে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নাগরিক দুর্ভোগের মধ্যেও এ ছবিটি মানবিক সংহতির এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নগরজীবনের প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আলোকচিত্রী মোহাম্মদ রুবেল ক্যামেরাবন্দি করেছেন চট্টগ্রামের এক মানবিক দৃশ্য। এক শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রাস্তার পাশে বসে পরম মমতায় একটি পথকুকুরের সঙ্গে নিজের রুটি ভাগ করে খাচ্ছেন। এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়সী দর্শকের আক্ষেপ, ‘আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের পাশ দিয়ে হাঁটি, কিন্তু কাউকে দেখি না। অথচ এ মানুষটির নিজেরই কিছু নেই, তবু সে ভাগ করে নিতে জানে।’ এই একটি কথাই যেন প্রমাণ করে, আলোকচিত্র মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে কতটা তীব্রভাবে নাড়া দিতে পারে।

এ ছাড়া প্রদর্শনীতে এবার ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী গ্রান্ট ২০২৬’ অর্জন করেছেন বান্দরবানের আলোকচিত্রী মং হাই সিং মারমা। পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়েছে গতবারের গ্রান্টজয়ী জাজং নকরেকের অনবদ্য কাজগুলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান কিংবা বেসরকারি চাকরিজীবী তানভীর রহমানের মতো অসংখ্য দর্শকের অনুভূতি একই–সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন দেখা ছবিগুলোই যখন একটি গ্যালারিতে একসঙ্গে সাজানো হয়, তখন তা আর কেবল ছবি থাকে না, হয়ে ওঠে একটি জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমান ইতিহাস।
দৃকপাঠ ভবনের এই আয়োজন শেষ পর্যন্ত কেবল কিছু পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবির প্রদর্শনী হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে আমাদের নিজেদের সমাজকে নতুন করে দেখার এক আয়না। প্রতিটি ছবি এখানে একেকটি গল্প বলে, হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী ভাষায় প্রশ্ন রেখে যায় আমাদের বিবেকের কাছে। ক্যামেরার চোখে দেখা এই দিনপঞ্জি তাই নিছক অতীত নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য এক অমূল্য সতর্কবার্তা।