ঢাকা রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

গ্যাস দুর্ঘটনা রুখতে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ‘ভ্যানগার্ড’

গ্যাস দুর্ঘটনা রুখতে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ‘ভ্যানগার্ড’
×

‘ভ্যানগার্ড’ যন্ত্র এবং গবেষণা দলের চার সদস্য–মোহাম্মদ ওমায়ের আহমেদ, মো. সাদাত রহমান, তাসনিম আল হোসাইন এবং কাজিম আল শাহরিয়ার

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩১ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

রান্নাঘর–যেখানে প্রতিদিন সেদ্ধ হয় চাল, তৈরি হয় পরিবারের আনন্দ আর তৃপ্তির আয়োজন। অথচ এক মুহূর্তের অসতর্কতায় সেই প্রাণবন্ত পরিসরটিই আজ পরিণত হয়েছে এক ভয়ানক মৃত্যুফাঁদে। বাংলাদেশে বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁগুলোয় গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ এখন আর নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এক ভয়াবহ ও সার্বক্ষণিক জাতীয় আতঙ্কের নাম।

এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েটের একদল শিক্ষার্থী সিদ্ধান্ত নেন একটি বাস্তবমুখী, নির্ভরযোগ্য ও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা প্রযুক্তি তৈরির। গবেষণা দলটির সদস্যরা হলেন–মোহাম্মদ ওমায়ের আহমেদ (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং), মো. সাদাত রহমান (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং), তাসনিম আল হোসাইন (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং কাজিম আল শাহরিয়ার (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং)। সুপারভাইজার হিসেবে রয়েছেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আলী আহম্মাদ শওকত চৌধুরী।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে; যেখানে সব মিলিয়ে গ্যাসসংশ্লিষ্ট অগ্নিকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশেরও বেশি।

আমাদের একটি সাধারণ অভ্যাস হলো–গ্যাস লিকেজ কিংবা গ্যাসের গন্ধকে ‘সাময়িক’ ভেবে অবহেলা করা। অথচ এটি এক নীরব ঘাতক। বদ্ধঘরে জমে থাকা দাহ্য গ্যাসে আগুন ধরার জন্য দেশলাই জ্বালানোর প্রয়োজন হয় না। ঘরের একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক সুইচের স্পার্ক, রেফ্রিজারেটরের কম্প্রেসরের অটো-কাট, এমনকি মশা মারার ব্যাটের সামান্য স্ফুলিঙ্গেই মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হতে পারে।

বাজারে বিদ্যমান প্রযুক্তিগুলোর দিকে তাকালে প্রধান দুটি সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। প্রথমত, প্রচলিত সাধারণ গ্যাস অ্যালার্মগুলো লিকেজ শনাক্ত করে কেবল উচ্চশব্দে অ্যালার্ম বাজাতে পারে। এরা নিজ থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা বা গ্যাস নিষ্কাশন করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, উন্নত বিশ্বের আধুনিক মেকানিক্যাল ও শিল্পমানের অটোমেশন সিস্টেমগুলো এতটাই ব্যয়বহুল, তা দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধ্যের একেবারেই বাইরে।

এই জটিল সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সংকট নিরসনে বুয়েটের গবেষক দল তৈরি করেন ‘ভ্যানগার্ড’। এটি মানুষের উপস্থিতি ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম একটি সমন্বিত ওয়্যারলেস নিরাপত্তা ইকোসিস্টেম। এটি কেবল দুর্ঘটনা ঘটার পর সংকেত দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করে না, বরং নিজ থেকে সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ নিশ্চিত করে।

গবেষণা দলের সুপারভাইজার আলী আহম্মাদ শওকত চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইমার্জেন্সি ডেটা ইন্টিগ্রেশন এবং নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে এই সিস্টেম স্থাপনে সরকার এবং আবাসন খাতের ডেভেলপারদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা।’

গবেষকরা জানান, দেশের সর্বস্তরের মানুষের নাগালের মধ্যে এই জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে সম্পূর্ণ ভ্যানগার্ড হার্ডওয়্যার প্যাকেজটির উৎপাদন ব্যয় অত্যন্ত সাশ্রয়ী রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আলী আহম্মাদ শওকত চৌধুরী আরও বলেন, ‘সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে তৈরি এই স্মার্ট গ্যাস লিকেজ ডিটেক্টর ইকোসিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেন্টিলেশন ফ্যান চালু এবং গ্যাস পাইপ বা সিলিন্ডার থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে অগ্নিদুর্ঘটনা রোধ করে প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি রক্ষা করবে।’

আরও পড়ুন

×