ঢাকা রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

বুড়িগঙ্গার ডকইয়ার্ড

লোহার চেয়েও কঠিন জীবন

লোহার চেয়েও কঠিন জীবন
×

ছবি :: দিয়েতমার টেম্পস

মোহাম্মদ রায়হান খান

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বুড়িগঙ্গার কালচে জলের ওপর সকালের রোদ পড়তেই কেরানীগঞ্জের পাড় থেকে ভেসে আসে একটানা হাতুড়ি পেটার শব্দ। বিশাল সব পুরোনো লঞ্চ আর জাহাজের গায়ে মরচে ধরা লোহায় অবিরাম আঘাত করে চলেছেন একদল মানুষ। লোহা কাটা আর ঝালাইয়ের তীব্র স্ফুলিঙ্গের মাঝেই তাদের রোজকার বসবাস। সিদ্দিক হাওলাদার, আলী হোসেন মনু, জাহাঙ্গীর আলম, মালকার আলী কিংবা পরান হোসেন লালু–তারা সবাই এই ডকইয়ার্ডের অতিপরিচিত মুখ। ৫৫ থেকে ৬০-এর কোঠায় বয়স তাদের। চামড়ায় বয়সের ভাঁজ, চোখের দৃষ্টি কিছুটা ঝাপসা হয়ে এলেও সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘাম ঝরানোর লড়াইয়ে কোনো বিরতি নেই। জীবনের এক নিদারুণ পরিহাস হলো, এই মানুষগুলোর বয়স যত বাড়ছে, শ্রমের আয় তত বাড়ছে না। 

বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের যখন নাভিশ্বাস, তখন এই শ্রমিকদের দিন কাটছে গভীর এক অনিশ্চয়তায়। প্রতিদিন উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও তাদের হাজিরা জোটে মাত্র ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে সংসার যেন এক ফুটো নৌকার মতো, যা কোনোমতে টেনেটুনে ভাসিয়ে রেখেছেন তারা। 

বুড়িগঙ্গাতীরের ডকইয়ার্ডগুলোয় কান পাতলেই শোনা যায় এই সুবিধাবঞ্চিত শ্রমিকদের বোবাকান্না আর বঞ্চনার গল্প। এ শ্রমিকদের বড় একটি অংশই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। জীবনের তাগিদে খুব ছোটবেলাতেই তাদের নামতে হয়েছে বেঁচে থাকার সংগ্রামে। ষাটোর্ধ্ব শ্রমিক আলী হোসেনের গল্পটা যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। ১০-১২ বছর বয়সে ঢাকায় এসে প্রথমে একটি হোটেলে গ্লাস ধোয়ার কাজ নেন। এরপর কিছুদিন বুড়িগঙ্গার ইঞ্জিনচালিত ট্রলারেও কাজ করেন। পরে শ্বশুর আলমগীর কবিরের হাত ধরে ডকইয়ার্ডের কাজে যুক্ত হন। তিন মেয়ে ও এক ছেলের বাবা আলী হোসেনের সন্তানদের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। 

আলী হোসেন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘স্ত্রীকে নিয়ে চর কালীগঞ্জ বাজারের কাছে ছোট একটা টিনের চালার বাসায় ভাড়া থাকি। জীবনে শুধু যুদ্ধই করে গেলাম। মাসে দুই হাজার ২০০ টাকা ঘর ভাড়া আর ৫০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতেই জান বেরিয়ে যায়। সকাল হলেই জীবন বাঁচাতে ঘর থেকে বের হতে হয়। মাঝেমধ্যে ভাবি, আর কতকাল এভাবে টানতে পারব!’

আরেক শ্রমিক গিয়াসউদ্দিন ব্যাপারীর (৫০) কণ্ঠেও একই হতাশা। চর কালীগঞ্জের আলম মিয়ার কলোনিতে ভাড়া থাকেন তিনি। অভাবের তাড়নায় সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারেননি। আক্ষেপ করে বলেন, ‘দুই মেয়ে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করে। তাদের বেতনের টাকা দিয়ে ঘরের ভাড়া দিই। আমার যে সামান্য মজুরি, তা দিয়ে কোনোমতে বাজার আর ওষুধপাতির খরচ চলে। ঘরে ভালো একটা খাট পর্যন্ত নেই। মেয়েগুলো বড় হয়েছে, কীভাবে তাদের বিয়ে দেব সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।’

ডকইয়ার্ডের কাজ কেবল পরিশ্রমের নয়, খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। লোহা কাটা, পেটানো বা ভারী পাত সরানোর সময় মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ভারী লোহার নিচে চাপা পড়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা এখানে খুব সাধারণ ঘটনা। অনেকের হাত-পায়ের নখ নষ্ট হয়ে গেছে, লোহার বিকট শব্দে অনেকের শ্রবণশক্তি কমে গেছে। চোখে বা হাত-পায়ে আঘাত পেলে বিশ্রাম নেওয়ার উপায় নেই। কারণ, কাজ বন্ধ মানেই সেদিন চুলায় হাঁড়ি চড়বে না। 

বাহাদুর ডকইয়ার্ডের শ্রমিক মো. সিদ্দিক হাওলাদার (৬৫)। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এই লোহালক্কড়ের সঙ্গেই তাঁর মিতালি। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘শ্রমিকদের আবার কোনো জীবন আছে নাকি! প্রায় প্রতিদিনই লোহার চাপায় কেউ না কেউ পঙ্গু হচ্ছে। কারও হাত যাচ্ছে, কারও পা, কারও বা চোখ-কান নষ্ট হচ্ছে।’

তিনি জানান, ডকইয়ার্ডে এখন যারা কাজ করছেন, তাদের বেশির ভাগই পুরোনো শ্রমিক। কাজের এই প্রচণ্ড ঝুঁকি এবং অমানবিক পরিশ্রমের কারণে নতুন প্রজন্মের কেউই আর এই পেশায় আসতে চাইছেন না। 

নাসির হাজি ডকইয়ার্ডের ৫৫ বছর বয়সী শ্রমিক আলী হোসেন মনু ২০ বছর বয়সে এ কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর মতে, শ্রমিকদের এই দুরবস্থার মূল কারণ হলো, জাহাজ ও ডক মালিকদের সিন্ডিকেট এবং লঞ্চ ব্যবসার বর্তমান ধস। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাত্রী কমে যাওয়ায় লঞ্চ ব্যবসায় যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তার সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন এই প্রান্তিক শ্রমিকরা। মালিকরা এই অজুহাতে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করছেন।

কেসি শাহ ডকইয়ার্ডের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সারাদিন ধুলাবালি আর লোহার গুঁড়ার মধ্যে পড়ে থাকি। অমানুষিক পরিশ্রমের তুলনায় মজুরি কিছুই না। আমরা মূর্খ মানুষ বলে আমাদের শ্রমের কোনো মূল্যায়ন নেই। কাজের বয়স বাড়ে, অভিজ্ঞতা বাড়ে কিন্তু আমাদের কপালে মজুরি বাড়ে না।’

কেরানীগঞ্জে আবদুর রহমান ডকইয়ার্ড, প্রিন্স আওলাদ, কেসি শাহ, বেবী সাহেব, কুমিল্লা, ইকবাল চেয়ারম্যান, সৈয়দ, ঢাকা ডকইয়ার্ডসহ অন্তত অর্ধশত ছোট-বড় ডকইয়ার্ড রয়েছে। এখানে কাজ করেন প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘ ৪০ বছর কাজ করেও বেবী শাহ ডকইয়ার্ডের মালকার আলীর (৬০) মতো প্রবীণ শ্রমিকরা আজ পর্যন্ত কোনো শ্রমিক সংগঠন হতে দেখেননি। 

অভিযোগ রয়েছে, মালিকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবেই কোনো শ্রমিক ইউনিয়ন বা সংগঠন গড়ে উঠতে দেয় না। এ ছাড়া কিছু স্বার্থান্বেষী শ্রমিকের কারণেও ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে কর্মক্ষেত্রে কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটলে বা কেউ পঙ্গু হয়ে গেলে মালিকদের কাছ থেকে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা সুবিধাও জোটে না।

বুড়িগঙ্গার জল হয়তো একদিন আরও শুকিয়ে যাবে, লঞ্চের সংখ্যা হয়তো আরও কমবে। কেরানীগঞ্জের ডকইয়ার্ডে হাতুড়ি আর লোহার এই অসম লড়াইয়ে ঘাম ঝরানো শ্রমিকদের ভাগ্য কি বদলাবে? নাকি বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরগুলো একদিন এই লোহালক্কড়ের মাঝেই নীরবে হারিয়ে যাবে? এ প্রশ্নের উত্তর অনাগত সময়ের জন্যই তুলে রাখা হলো। 

আরও পড়ুন

×